ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসাসহ নানা কাজে বিদেশে ভ্রমণ করতে গিয়ে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের প্রবণতা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারতে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা, বিনোদন, কেনাকাটাসহ নানা কারণে ভ্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এতে বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় ভারতে ক্রেডিট কার্ডে বেশি খরচ করে থাকেন বাংলাদেশিরা। ভিসা কার্ড, মাস্টারকার্ড, অ্যামেক্স কার্ড, ডাইনারস কার্ড, ইউনিয়ন পে ও জেসিবি কার্ড ব্যবহার করে এই অর্থ খরচ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশি একজন নাগরিক বিদেশে যাওয়ার সময় বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার সঙ্গে নিতে পারেন।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, একক দেশ হিসেবে ভারতেই ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি খরচ করেন বাংলাদেশিরা, যা দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট খরচের চার ভাগের এক ভাগ। সবশেষ চলতি বছরের মে মাসে ভারতে গিয়ে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছেন ৮২ কোটি টাকা, এপ্রিলে এই খরচ ছিল ৭৩ কোটি টাকা।
এদিকে ভারতের পরে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ করেন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে। মে মাসে দেশটিতে গিয়ে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা ব্যয় করেছেন প্রায় ৭১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সৌদি আরবে খরচ করছেন ৬৩ কোটি থাইল্যান্ডে গিয়ে খরচ করেছেন ৪০ কোটি টাকা। এরপর দুবাই ও সিঙ্গাপুরে যথাক্রমে খরচ করেছেন ৩৬ ও ৩০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, সব মিলে মে মাসে দেশের বাইরে গিয়ে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা ব্যয় করেছেন ৪৮৪ কোটি টাকা, যা এপ্রিলে ছিল ৩৬৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এ সময়ে দেশের ভেতরে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমেছে। ফলে কমেছে এর মাধ্যমে লেনদেনও।
তবে দেশের অভ্যন্তরে স্থানীয়দের লেনদেন কমলেও বেড়েছে বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেন। অর্থাৎ মে মাসে দেশে বিদেশি নাগরিকরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করেছেন ২১০ কোটি টাকা, যা এপ্রিলে ছিল ১৭০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে ২৩ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি নাগরিকদের তুলনায় বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশের বাইরে গিয়ে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন এই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, কয়েক বছর ধরে বিদেশে ভ্রমণ বেড়েছে। করোনার কারণে মাঝে তা বন্ধই ছিল বলা যায়। এখন আগের মতোই মানুষজন ভ্রমণ, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে বিদেশে যাচ্ছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে। আর বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে কার্ডের ব্যবহার বেশি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে আসা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। সম্মিলিতভাবে বিদেশি নাগরিকরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে পরিমাণ খরচ করেন, এর এক-চতুর্থাংশের বেশি ব্যয় করেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
গত মে মাসে তারা খরচ করেছেন ৬১ কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশে এসে কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা। তারা এই সময়ে ব্যয় করেছেন ২৮ কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে ভারতের নাগরিকরা ব্যয় করেছেন ২৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বাংলাদেশে ব্যয় করার দিক থেকে তালিকায় উপরের দিকে রয়েছে সিঙ্গাপুর, চীন, কানাডা, জাপান, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিদেশের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বাংলাদেশিরা ১৯৯ কোটি টাকার কেনাকাটা করেছেন। এছাড়াও ওষুধ কিনেছেন ৭১ কোটি টাকা, কাপড় কিনেছেন ৫৫ কোটি টাকা, যাতায়াতে ব্যয় করেছেন ৪০ কোটি টাকা, নগদ উত্তলোন করেছেন ৩৬ কোটি টাকা, ব্যবসার সেবা বাবদ ব্যয় করেছেন ২৫ কোটি টাকা, পেশাগত ব্যয় ২৫ কোটি টাকা, সরকারি সেবা ১৮ কোটি টাকা, ইউটিলিটি সেবা বাবদ ব্যয় করেছেন ১০ কোটি টাকা।
মন্তব্য করুন