

ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের সব প্রদেশের বহু শহরে প্রতিদিন রাতভর রাস্তায় নামছেন লাখ লাখ মানুষ। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার দরপতন, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন শুরু হলেও এখন তা সরাসরি সরকার উৎখাতের দাবিতে রূপ নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আন্দোলন সফল হলে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে। এতে শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
শত শত মৃত্যু, হাজারো গ্রেপ্তার
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, গত দুই সপ্তাহে সরকারি দমন-পীড়নে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে গতকাল রয়টার্স বলেছে, নিহত দুই হাজার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ইন্টারনেট ও ফোন পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ইরানে ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের পরিস্থিতি ‘খুব গুরুত্ব দিয়ে’ পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। মার্কিন সেনাবাহিনী এরই মধ্যে সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরেছে হোয়াইট হাউসের সামনে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে ইন্টারনেট যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে ইলন মাস্কের স্টারলিংক পরিষেবা ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
তেলের বাজারে প্রভাব
ইরান ওপেকভুক্ত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম। বিক্ষোভের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৩ ডলারের ওপরে উঠেছে।
রাশিয়ার জন্য বড় ধাক্কার আশঙ্কা
ইরানে সরকার পতন হলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বড় এক কূটনৈতিক মিত্র হারাবেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর পতন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর ইরানকে হারালে রাশিয়ার প্রভাব আরও দুর্বল হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকার দুর্বল, কিন্তু এখনো শক্তিশালী
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ, অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতিতে ইরানের সরকার দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনো তাদের হাতে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখনো সরকারের পাশে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সরকারের সম্পূর্ণ পতন নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও শাসনব্যবস্থা টিকে যাওয়া, সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান, দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতা ও অস্থিরতা।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই আশঙ্কা করছে, ইরানে সরকার পতনের পর যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে—যেমনটা দেখা গিয়েছিল আরব বসন্তের সময়।
ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ আন্দোলন দেশটিকে গণতন্ত্রের পথে নেবে না কি আরও রক্তক্ষয় ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরানের এ সংকট বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে।
মন্তব্য করুন