

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ। তেহরানের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাগ্যুদ্ধের মধ্যে এ তথ্য জানা গেল। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর বলছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও ইরানে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সব ফ্রন্টে প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের কাছে পৌঁছেছে ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড় ‘আর্মাডা’। এমন প্রেক্ষাপটে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা আক্রান্ত হলে সব সর্বোচ্চ দিয়ে জবাব দেওয়া হবে। এতে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ল।
গত সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছেছে।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমরা একটি আর্মাডা (যুদ্ধজাহাজের বড় বহর) ইরানের উদ্দেশে পাঠিয়েছি। যদি প্রয়োজন পড়ে…মানে আমি বলছি না যে কোনো কিছু ঘটতে যাচ্ছে, হয়তো এই বহর আমাদের ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না, তবে আমরা তাদের (ইরান) নিবিড় নজরদারির মধ্যে রাখছি।
আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছন, অদূর ভবিষ্যতে যে কোনো সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে ইরান। সেসব হামলা ঠেকাতে আগাম সতর্কতা হিসেবে এই যুদ্ধজাহাজের বহরে কিছু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠানো হচ্ছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ‘নির্ভুল হামলা’ চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা চলতি সপ্তাহেই হতে পারে, তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময় পরিবর্তন হতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা বেশ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তারা ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের পরিণতি নিয়ে বিভক্ত মত পোষণ করেন।
এক মাস ধরে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রথমে বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানালেও পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণেই ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে।
যদিও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতি টেনেছে, তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল সাময়িক বিরতি।
এর আগে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই ধরনের কৌশল নিয়েছিলেন। পরে সেখানে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো তেহরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছাড়েননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারির তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার জন্য অনেক বেশি সামরিকভাবে প্রস্তুত। এরই মধ্যে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। এই সামরিক প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, তাদের দেশে হামলার জন্য আরব দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার হলে সেসব দেশও হামলার শিকার হবে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও তুরস্ক ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছে। তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান হামলার পক্ষে রয়েছে।
এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। তবে আগে থেকে সতর্ক করায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলায় নতুন কোনো মার্কিন হামলাকে দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে ইরান আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যেমন—মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।
যক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে এর জেরে তেহরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সব ফ্রন্টে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। আইডিএফের উত্তর কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল রাফি মিলো চ্যানেল ১২ নিউজকে বলেন, আমরা জানি না পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে সামরিক শক্তি জড়ো করছে। মিলো জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা প্রস্তুত ও সতর্ক আছি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে তার প্রভাব ইসরায়েলে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। তিনি বলেছেন, বিশাল মার্কিন ‘আর্মাডা’ বা নৌবহর ইরানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই আর্মাডা ভেনেজুয়েলা অবরোধ করা মার্কিন নৌবহরের চেয়েও বড়। তাই ইরান সমঝোতা না চাইলে হামলার বিকল্পও হাতে রাখা হয়েছে।
সোমবার গভীর রাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ‘এক বিশাল আর্মাডা’ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার পর ইরান পরিস্থিতি এখন ‘পরিবর্তনশীল অবস্থায়’ রয়েছে। তিনি যোগ করেন, তার বিশ্বাস, তেহরান সত্যিই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।
অ্যাক্সিওসের উদ্ধৃতিতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলেছেন, সামরিক হামলার পথ এখনো একটি বিকল্প হিসেবে খোলা রয়েছে। তারা জানান, ট্রাম্প এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে আরও পরামর্শ করবেন এবং অতিরিক্ত সামরিক বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন