

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি আততায়ীর বন্দুকের নলে নিশানা হওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। নির্বাচনী তপশিলের আগে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রমও দৃশ্যমান ছিল না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে কার্যকর উদ্যোগ ছিল না বলে এখন নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভোটের ‘ট্রেন’ চলার পর সেই প্রভাব পড়ছে রাজনীতির মাঠে। তবে এখনই তা ঠিক করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করছেন না। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিরাপত্তায় এরই মধ্যে নানা পরিকল্পনা নেওয়া শুরু হয়েছে। অবৈধ ও লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও দেশবিরোধীদের গ্রেপ্তারসহ নানা ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে জোরালো অভিযানের ঘোষণা এসেছে।
শনিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের ঘটনা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস বলে আমরা মনে করি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত বা বানচাল করার যে কোনো অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হস্তে দমন করবে।’
তিনি বলেন, যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, তারা যদি আগ্নেয়াস্ত্র চান, তাদের লাইসেন্স দেওয়া হবে। এ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া যাদের আগ্নেয়াস্ত্র সরকারের কাছে জমা আছে, সেগুলো ফেরত দেওয়া হবে।
জাতীয় নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের দমনের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২’ চালু করা হবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, এই যে অস্ত্রবাজি, সহিংসতা, বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা, হুমকি-ধমকি এবং নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার যে প্রবণতা—এটা আমরা শেখ হাসিনার আমলেও দেখেছি, সামনে যে নির্বাচন আসছে সেখানেও দেখছি।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী এবং ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলার জন্যই তো এগুলো (সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড) হচ্ছে। হয় নির্বাচন ভন্ডুল করার জন্য, না হয় নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার জন্য এগুলো হচ্ছে। আমরা যদি এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। পর দিন শুক্রবারই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। ওসমান হাদি বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন তিনি। হাদির ওপর এই হামলার প্রতিবাদে সারা দেশ এখন উত্তাল। এই ঘটনার প্রতিবাদে নানা ধরনের কর্মসূচিতে সরব হয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নির্বাচন ও ভোট ইস্যুতে বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভক্তি থাকলেও ওসমান হাদির ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা সব দলকে আবারও এক কাতারে এনেছে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে দলগুলো। এ বৈঠকে অংশ নেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রতিনিধিরা। ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ক্ষোভ দেখান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শহীদ মিনারে নতুন করে বড় ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার চেয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশনও। চিঠিতে সিইসি, অন্য চার কমিশনার ও সিনিয়র সচিবসহ সারা দেশে নির্বাচনী অফিসগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অস্ত্রের লাইসেন্স ভোটের আগে রাজনৈতিক মাঠে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। কারণ সব সময়ই আগ্নেয়াস্ত্রের অপব্যবহারের একটা শঙ্কা থেকেই যায়। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই নিরাপত্তার দায়িত্বটা নিতে হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। এর আগেও চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সন্ত্রাস দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু করে সরকার। তবে তাতে যে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি, তা সাম্প্রতিক অস্ত্রবাজির ঘটনাতেই প্রকাশ পাচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন কালবেলাকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব যে ভালো, সেটা বলার সুযোগ নেই। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রার্থীদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্সের কথা বলেছেন। তবে শেখ হাসিনা তার আমলে দলীয় নেতাকর্মীদের অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছিল, সেই অস্ত্র এখন কোথায়, কীভাবে আছে তো আমরা জানি না। সেগুলোর দিকে গুরুত্ব না দিয়ে আরও কিছু মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দিলে অস্থিরতার সম্ভাবনাই আমি দেখি।’
তিনি বলেন, দুর্বৃত্তরা যেন অপরাধ করার আগে ভয় পায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেন স্বস্তি আসে, এমন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা সুষ্ঠু এবং উৎসবমুখর নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কি না—জানতে চাইলে নূর খান লিটন বলেন, কিছুটা প্রভাব তো অবশ্যই পড়বে। তবে এখনো সময় আছে, দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এখনো জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে অন্তত দুই ঘণ্টা ধরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা চলে। সেখানে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ার যে কথা বলেছেন, তা কার্যকর করতে বিদ্যমান অস্ত্র নীতিমালা কিছুটা শিথিল করার বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। তবে কতটা শিথিল হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে দুই থেকে তিন মাসের জন্য পিস্তল বা শটগানের সাময়িক লাইসেন্স দেওয়ার প্রাথমিক চিন্তা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সুপারিশের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকালের বৈঠক থেকে পুলিশের বিশেষ শাখাকে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
প্রার্থীদের সবাইকে গানম্যান দেওয়া সম্ভব হবে না বলেও আলোচনায় উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ঝুঁকিতে রয়েছেন, এমন প্রার্থীদের জন্য গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি কোনো কোনো হাইপ্রোফাইল প্রার্থী নিজেদের বাড়িতে নিরাপত্তা চাইলে তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু শর্ত পূরণ করার বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। শর্তগুলো নির্ধারণের জন্য একটি নিরাপত্তা প্রটোকল তৈরি করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের কেউ বাড়তি নিরাপত্তা চাইলে তাদের বাড়িতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, দারোয়ান রাখা, আর্চওয়ে বা ডিটেকটিভ যন্ত্রপাতি স্থাপন সংক্রান্ত শর্ত পূরণের প্রটোকল পূরণ করতে হতে পারে। নিরাপত্তায় পুলিশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
গতকাল ঘোষিত অপারেশন ডেভিল হান্ট-২-এর বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, ডেভিল হান্ট বন্ধ হয়নি, তবে অভিযানের মাত্রা কমে এসেছিল। তবে ডেভিল হান্ট-২-এ সেটা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত এবং নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তারে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে অপারেশনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন যাতে না হয়, বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, নির্বাচনের তপশিলের আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখা উচিত ছিল। তাহলে এখন রাজনীতির মাঠে অস্থিরত থাকত না, সবাই এখন ভোটের উৎসবের দিকে যেত। তবে এখনো পরিস্থিতি ঠিক করার যথেষ্ট সময় রয়েছে এবং সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই করতে হবে। প্রার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারের মনেও নিরাপত্তার বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে।
মন্তব্য করুন