

রাজধানীর পুরান ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্রে কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নকলের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রের শৌচাগার ও ওয়াশরুম, যেগুলো নকলের ‘সেফ জোন’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে কেন্দ্রের হল ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু পরীক্ষার পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সরেজমিন দেখা যায়, অনার্সের পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রের শৌচাগারের জানালার কোনা, ফ্লাশ ট্যাংক, দরজার পেছনসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে মূল বই, গাইড ও হাতে লেখা নোট। এমনকি মূল বই ও গাইড থেকে উত্তর ফটোকপি করে ছোট আকারে কেটে আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শুধু শৌচাগার নয়, ওয়াশরুমের ভেতরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বেসিনের আশপাশে বইয়ের ছেঁড়া পৃষ্ঠা, নোট ও খাতায় লেখা উত্তর পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরীক্ষা শেষে শৌচাগারগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব কাগজপত্র নকলের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দৃশ্যমান হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরীক্ষা শুরুর আগেই পরীক্ষার্থীরা বিভিন্ন অজুহাতে হলে প্রবেশ করে ওয়াশরুম ও শৌচাগারের আশপাশে নকলের উপকরণ লুকিয়ে রাখে। পরে পরীক্ষা চলাকালীন বাথরুমে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে সেসব তথ্য মুখস্থ করে বা কখনো সরাসরি চিরকুট হলে নিয়ে এসে উত্তর লেখে।
গেটে দায়িত্বে থাকা একাধিক চেকিং কর্মী জানান, তল্লাশির সময় কিছু নকল জব্দ করা গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ধরা সম্ভব হয় না। তাদের ভাষ্য, পরীক্ষার্থীরা শরীরের স্পর্শকাতর অংশ বা এমন জায়গায় নকল লুকিয়ে রাখে, যেখানে তল্লাশি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে এই অনিয়মের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে শিক্ষার্থীরা নকলের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে পরীক্ষা হলের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তারা কলেজ প্রশাসন ও পরীক্ষা কমিটির উদাসীনতাকে দায়ী করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ ধরনের গণহারে নকল উচ্চশিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাদের মতে, যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশ নেয়, তাদের ফলাফলের চেয়ে নকল করে পাওয়া নম্বর বেশি হয়ে উঠছে, যা চরম অন্যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরীক্ষার্থী জানান, হলে দায়িত্বরত শিক্ষকদের নজরদারি দুর্বল থাকায় পরীক্ষার্থীরা বারবার বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই শিথিলতার সুযোগ নিয়েই একটি চক্র আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে নকল লুকিয়ে রেখে তা নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছে।
অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, কবি নজরুল সরকারি কলেজের কিছু পরীক্ষার্থী নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই পরীক্ষাকে প্রহসনে পরিণত করেছে। নকলকে তারা ‘স্বাভাবিক বিষয়’ হিসেবে ধরে নিয়েছে, যা পুরো কেন্দ্রের শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করছে।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, একটি কলেজের পরীক্ষার্থীরা যদি এভাবে গণহারে নকল করে ভালো ফল করে, তাহলে সৎভাবে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না। এটি সরাসরি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা।
তারা দাবি করেন, কবি নজরুল সরকারি কলেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত না করে এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে অন্যান্য পরীক্ষাকেন্দ্রেও একই অনিয়ম ছড়িয়ে পড়বে। এতে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।
সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কাকলী মুখোপাধ্যায় বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল বা যে কোনো ধরনের অসদুপায় অবলম্বনের বিষয়ে আমাদের অবস্থান কঠোর। কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বাথরুমে আগে থেকে নোট বা বই লুকিয়ে রাখার অভিযোগ রোধে একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে পরীক্ষা চলাকালীন তল্লাশি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন