

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সংক্রান্ত চলমান প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। এ আদেশের ফলে এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে কোনো বাধা থাকল না। তবে আদালতের এই আদেশের পরপরই দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির। এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে
দেওয়ার আশঙ্কায় শ্রমিক-কর্মচারীরা শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পরপরই তা স্থগিত চেয়ে রিটকারীপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করেন। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেননি চেম্বার আদালত। চেম্বার আদালত পূর্ণাঙ্গ আপিল করতে বলেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক কালবেলাকে বলেন, “হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রিটকারীপক্ষ চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করেন। চেম্বার বিচারপতি তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নো অর্ডার’ আদেশ দিয়েছেন। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল রয়েছে।”
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
রিট থেকে রায়: নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্পৃক্ততা নিয়ে আইনি বিতর্ক শুরু হয় গত বছর। বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি সংক্রান্ত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩০ জুলাই হাইকোর্ট রুল দেন। এরপর ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চে রিটের ওপর বিভক্ত রায় হয়। দ্বৈত বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব ২০১৫ সালের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আইন ও ২০১৭ সালের জিটুজি নীতিমালা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। তবে একই বেঞ্চের অন্য বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রুল ডিসচার্জ করে রিট খারিজের পক্ষে মত দেন।
বিভক্ত রায়ের পর প্রধান বিচারপতি গত ১৫ ডিসেম্বর বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। শুনানি শেষে গতকাল একক বেঞ্চ রুল ডিসচার্জ করে রায় দেন। ঘোষিত রায়ে বলা হয়, দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক আইনগতভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি অনুযায়ী কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরাসরি নির্বাচন কিংবা দরপত্র—উভয় পথই বৈধ। যেহেতু এখনো কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি এবং কোনো আইনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়নি, তাই রিটটিকে ‘অপরিপক্ব’ বলে উল্লেখ করেন আদালত।
রায়ের পরই উত্তাল বন্দর: হাইকোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের কারশেড ও আশপাশের এলাকায় বন্দর রক্ষা পরিষদসহ বিভিন্ন শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান।
শ্রমিক নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামীকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রোববার একই সময়ে প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। দাবি আদায় না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, আদালতের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটি শুধু চাকরি বা কর্মসংস্থানের প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত টার্মিনাল এনসিটি: ২০০৭ সালে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত। টার্মিনাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীন চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড টার্মিনালটি পরিচালনা করছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ লাখ ১৩ হাজারের বেশি টিইইউ। এতে মোট আয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। প্রতি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে বন্দরের গড় আয় প্রায় ১৬১ ডলার।
দেশীয় অপারেটর ও শ্রমিকদের দক্ষতায় এনসিটির সক্ষমতা নকশাগত ধারণক্ষমতার চেয়েও বেড়েছে। ২০০৭ সালে যেখানে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ছিল ১০-১২ দিন, সেখানে বর্তমানে তা কমে এসেছে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায়।
বিদেশি অপারেটর এলে রাজস্ব হিসাব কী দাঁড়ায়: বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তি কাঠামো অনুযায়ী বিদেশি অপারেটর প্রতি টিইইউএসে প্রায় ১৬১ ডলার আয় করবে, আর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ৫০ ডলার। ২০২৫ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের হিসাব ধরে দেখা গেলে, বছরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ আয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে যাবে। বিপরীতে বন্দর পাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক সংগঠন ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, কোনো ধরনের নতুন বিনিয়োগ ছাড়াই এত বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন ডলার সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগ: এনসিটির আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, কর্ণফুলী নদীর কৌশলগত অবস্থান এবং ঘনবসতির বিষয়টিও আন্দোলনকারীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। শ্রমিক নেতাদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাদের মতে, লাভজনক ও কৌশলগত একটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বন্দর ও লজিস্টিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের মূল সংকট বিদেশি অপারেটরের অভাব নয়। বরং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা, শক্তিশালী পশ্চাৎ সংযোগ, পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের সক্ষমতা বাড়ানোই এখন বেশি জরুরি। তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ হলে তা নতুন বন্দর বা ভবিষ্যৎ চাহিদাভিত্তিক প্রকল্পে হওয়া উচিত। বিদ্যমান লাভজনক টার্মিনাল হস্তান্তরের মাধ্যমে নয়।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন কালবেলা প্রতিবেদক, ঢাকা
মন্তব্য করুন