

সবকিছু ঠিক থাকলে আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে বহুল আলোচিত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট। দেশজুড়ে পুরোদমে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে টানা গণসংযোগ করছেন সংসদ সদস্য প্রার্থী ও তাদের লোকজন। এখন আলোচনায় এসেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের গণসংযোগে দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার বিষয়টি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভিযোগ, তারা জামায়াতসহ জোটের অন্যদের থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। সম্প্রতি ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের গণসংযোগে বাধা এবং ঢাকা-৮ আসনে দলের অন্য প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে হেনস্তা ও ডিম ছুড়ে মারার ঘটনার প্রতিবাদে অন্য দলের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি তেমনটা দেখা যায়নি। তবে জোটের অধিকাংশ দলের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, তারা পরস্পরের পক্ষে কাজ করছেন। প্রচারণার শেষদিন পর্যন্ত তারা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাবেন।
জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারাও জানিয়েছেন, তাদের নেতাকর্মীরা সব আসনে আগের মতোই শরিক প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জোটের শরিকরাও জামায়াতের প্রার্থীদের সহযোগিতা করছেন।
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১টি রাজনৈতিক দলের একটি নির্বাচনী জোট। প্রাথমিকভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সমমনা আটটি দল নিয়ে গঠিত জোটটি আন্দোলনরত আট দল ব্যানারে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচনের আগে গণভোট, সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আসন সমঝোতার স্বার্থে এনসিপিসহ তিনটি দল যোগ দিলে তা ১১ দলীয় জোটে পরিণত হয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েন ও জামায়াতে ইসলামী শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন বিষয়ে অসম্মতির কারণে শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর গত ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ লেবার পার্টি এই জোটে যোগ দিলে তা আবারও ১১ দলের নির্বাচনী জোট হয়।
জানা গেছে, জোটে থাকা না থাকার আলোচনার মধ্যেই গত ১৬ জানুয়ারি রাতে সমঝোতার ভিত্তিতে ২৫৩টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনশ আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৭৯, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫, খেলাফত মজলিস ১০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ৭, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৩, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩ এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুটি আসন দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে ১১ দলীয় জোটের মধ্যে কোনো আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
সব আসনে সহযোগিতা পাচ্ছে না এনসিপি: দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপিকে ৩০টি আসনে ছাড় দিলেও কয়েকটি আসনে জোটের প্রধান দল জামায়াতের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাচ্ছে না তারা। এসব আসনে নামে ১১ দল হলেও অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতিতে হাঁটতে হচ্ছে এনসিপির প্রার্থীদের।
দল সূত্রের দাবি, নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে অন্তত ৫ থেকে ৭টি আসনে জামায়াতের সহযোগিতা পায়নি এনসিপি। দুটি আসনে যথাক্রমে নরসিংদী-২ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহারই করেননি জামায়াতের প্রার্থীরা। যদিও প্রতীক পাওয়ার পর চট্টগ্রাম-৮ থেকে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু নাছের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। সরে দাঁড়ালেও ওই আসনে এনসিপি প্রার্থীকে মেনে না নেওয়া ও সহযোগিতা না করার অভিযোগ ওঠে জামায়াতের বিরুদ্ধে।
এ আসনের এনসিপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনো পর্যন্ত সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে না জামায়াতের নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম-৮ আসনের জোটের প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘দশ দলীয় (বর্তমানে ১১ দল) জোটের পারস্পরিক অসহযোগিতা দিন শেষে বিএনপি বলয়কে শক্তিশালী করবে পুরো দেশে। এই সরল সত্যটুকু বুঝতে পারতে হবে দশ দলের সবার। নইলে পরাজয় অবধারিত।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা নরসিংদী-২ আসনে। এ আসনে জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার (সারোয়ার তুষার)। তবে জামায়াতের প্রার্থী আমজাদ হোসাইন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি এবং প্রকাশ্যে জোটের প্রার্থীকে সমর্থনও জানাননি। স্থানীয়রা বলছেন, ভোটের মাঠে সরাসরি মাঠে না নামলেও গোপনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাচ্ছেন অনেক নেতাকর্মী। শেষ পর্যন্ত জোটের প্রার্থী সারোয়ার তুষারকে সরাসরি সমর্থন না জানালেও ভোটের মাঠে বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা আশা করি, জোটের স্বার্থে সবাই মাঠে নামবে। আমরা একদমই আন্তরিকতা পাচ্ছি না, তা নয়। তবে আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। আশা করি, সেটাও আমরা পাব। জামায়াতের প্রার্থী দীর্ঘদিন এ আসনে কাজ করেছেন। উনার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা রয়েছে। তার অভিজ্ঞতা জোট এবং এ আসনে জয়ের জন্য শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।’
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ও এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ, ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনে জোটের প্রার্থী দিলশানা পারুল এবং ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনের জোটের প্রার্থী এনসিপির নাবিলা তাসনিদও শুরুতে জামায়াতের সমর্থন সেভাবে পাননি। তবে এসব আসনে জামায়াতের নেতাকর্মী অনেককেই প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, অধিকাংশ আসনে জামায়াত সর্বোচ্চ সহযোগিতা করলেও কিছু আসনে সহযোগিতা তারা পাচ্ছে না। ওইসব আসনের প্রার্থীরাও অভিযোগ জানিয়েছেন। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদেরও বিষয়টি জানিয়েছেন তারা। আজ শুক্রবারের মধ্যে এটি সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা তাদের।
এ বিষয়ে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন কালবেলাকে বলেন, ‘কিছু জায়গায় আমরা অসহযোগিতা পাচ্ছি। বিশেষ করে গত দেড় বছরে মাঠ গোছানো জামায়াতের কিছু প্রার্থী মনঃক্ষুণ্ন। তাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও জোটের স্বার্থ দেখাও তাদের দায়িত্ব। কিছু জায়গায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন, কিন্তু প্রার্থী এখনো সমর্থন দেয়নি। এসব বিষয় নিয়ে আমরা জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারাও আমাদের দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করি, ৩০ জানুয়ারির (আজ) মধ্যেই এটির সমাধান হবে এবং জোটকে বিজয়ী করতে সবাই সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’
অন্য শরিকরা যা বলছেন: ১১ দলের শরিক বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক চান কালবেলাকে বলেন, জোটের সব দল একে অন্যকে সহযোগিতা করছে। আমি নিজেও আমার আসনে (ময়মনসিংহ-৯) সব দলের সহযোগিতা পাচ্ছি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইজহার বলেন, তার দলের নেতাকর্মীরা সব জায়গায় ১১ দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। সেইসঙ্গে তাদের দলের প্রার্থী যে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেখানেও বাকি দশ দলের নেতাকর্মীরাও সহযোগিতা করছেন। তবে সুনামগঞ্জ-১ আসনে তাদের দলকে দেওয়া হলেও সেখানে জামায়াতের প্রার্থী এখনো রয়েছেন। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা সাইফুল ইসলাম সুনামগঞ্জী বলেন, জামায়াতে ইসলামী এখনো তাদের নির্দিষ্টভাবে কোনো আসনে সমর্থন দেয়নি। তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আটজন প্রার্থী গণসংযোগ চালাচ্ছেন। হয়তো আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধান হবে। এ বিষয়ে দলের আমির ভালো বলতে পারবেন। তবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও দলের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচনী ঐক্যে লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান কালবেলাকে বলেন, ‘সব আসনেই আমাদের দলের নেতাকর্মীরা ১১ দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কারণ, সব আসনেই নির্বাচনের জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল। যেহেতু সমঝোতার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হয়েছে, তাই শরিকরা অনেকটা রেডিমেড আসন পেয়েছেন।’ একে অন্যকে সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী। এখানে জোটের যেসব দল রয়েছে তারা সবাই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। তবে কোনো গ্যাপ থাকলে সেটি দ্রুতই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।’
মন্তব্য করুন