

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া পোস্টে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, তাদের আমিরের অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড করে পোস্টটি করা হয়েছিল বলে জামায়াত দাবি করলেও, তা সত্য নয়। এমন অবমাননাকর মন্তব্যে দেশজুড়ে সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে নিজেদের রক্ষায় এখন মিথ্যা বলছে জামায়াতে ইসলামী। তারেক রহমান বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা পরিষ্কারভাবে দুদিন আগে বলেছেন, যে সকল মহিলা, যে সকল মা-বোনেরা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যান, তাদেরকে এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা কলঙ্কস্বরূপ। এই কথা বলার পরে যখন তীব্র সমালোচনা শুরু হলো, তখন তারা বলছে আমাদের আইডি নাকি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তারা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, আইডি এভাবে হ্যাক হতে পারে না।’ গতকাল সোমবার দুপুরে যশোর উপশহর কেন্দ্রীয় ক্রীড়া উদ্যানে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিএনপি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘একটি দল ৫ আগস্টের পর মা-বোনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে ও মা-বোনদের ঘরে বন্দি করতে চাচ্ছে। তারা এনআইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। তাহলে অসৎ প্রস্তাব দিয়ে তারা কীভাবে সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের মতো আমি-ডামি আর নিশিরাতের ভোট করে যেভাবে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি দল। ভোট গণনার নামে কেউ কোনো সুযোগ নিতে চাইলে তাদের প্রতিহত করতে হবে।’
তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খননকৃত সেই উলাসী খালসহ এ অঞ্চলের খাল-বিল পুনঃখনন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জিকে প্রকল্প ফের চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে সব প্রকল্প নেওয়া হবে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও হিন্দু ধর্মের পুরোহিতদের রাষ্ট্র সম্মানী দেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়বে।’ বিএনপি সরকার গঠন করলে যশোরের ফুলকে বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ এবং অঞ্চলের চিনি শিল্পগুলোকে ফের চালু করারও প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসনে খোকনের পরিচালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি, বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, অধ্যাপক নার্গিস বেগম, সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল প্রমুখ। জনসভা শেষে তারেক রহমান জুলাই যুদ্ধাহত এবং শহীদদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
যাদের কাছে নারীদের সম্মান নেই, তাদের কাছে দেশ নিরাপদ নয়: ‘যারা নারীদের অসম্মান করে, মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে, তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না, তাদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়।’ গতকাল দুপুরে খুলনার প্রভাতী স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন। দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। শুধু একটি শ্রেণিকে নিয়ে কখনোই দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়।’
দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় গিয়ে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেন তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খালিশপুরের প্রভাতী স্কুল মাঠে আসেন বিএনপি চেয়ারম্যান। মঞ্চে উঠলে নেতাকর্মী-সমর্থকরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। তারেক রহমান হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। তিনি প্রায় ২৭ মিনিট বক্তব্য দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারী সমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, দেশকে সামনে নেওয়া সম্ভব নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।’
নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ‘একটি দল প্রকাশ্যে নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বলতেও লজ্জা লাগে। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো দেশের জন্যই কলঙ্ক।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ তাদেরই আজ অপমান করা হচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে—নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহলে নারীদের কর্মজীবনকে অপমান করার এখতিয়ার কারও নেই।’
বিএনপি চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, ‘ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ওই রাজনৈতিক দল আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের আসল চরিত্র প্রকাশ করছে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি ও ধানের শীষের এ জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এ সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার, লাখো নেতাকর্মী—বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা—গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ টানা ১৬ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেনি। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলে তাকে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে কিংবা খুন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। আজ সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। আগামী ১২ তারিখে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে, যা থেকে এক যুগের বেশি সময় ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এ কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকেন।’ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এ অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।’
তরুণ সমাজের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এস এম শফিকুল আলম তুহিনের পরিচালনায় জনসভায় আরও বক্তৃতা দেন খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী আলী আসগর লবী, খুলনা-১ আসনের প্রার্থী আমির এজাজ খান, খুলনা-৬ আসনের প্রার্থী এস এম মনিরুর হাসান বাপ্পী, সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল রউফ, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন, সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান, বাগেরহাট-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, বাগেরহাট-২ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার জাকির হোসেন, বাগেরহাট-৩ আসনের প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-৪ আসনের প্রার্থী সোমনাথ দে প্রমুখ।