রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ

জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার দরজা খোলা রাখছে বিএনপি

ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ বিএনপি। এই অঙ্গীকার থেকে একচুলও সরতে চায় না দলটি। সনদ নিয়ে বিএনপির এমন অবস্থানও রয়েছে যে, যেসব বিষয়ে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। দলটির নেতারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে মাথায় রেখেই বিএনপি সরকার কাজ করছে। নির্বাচনী ইশতেহার তারা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এ জন্য সময় প্রয়োজন। তাই বিরোধী দলকে অহেতুক চাপ সৃষ্টি না করে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ঐকমত্য কমিশন অনৈক্যের ভিত্তিতে হ্যাঁ-না (গণভোট) ভোট করতে গিয়ে আজকের এই জাতীয় সংকট তৈরি করেছে। এর দায় বিএনপির নয়, দায় ঐকমত্য কমিশনের।

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। আদেশটির উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাস্তবায়ন করা। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, অনুরূপ পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার শেষ দিন ছিল গত রোববার।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে গত রোববার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত এক আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তা কোনো অবৈধ বা আরোপিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে চলতে হবে সাংবিধানিক পথে। রাষ্ট্র কোনো আবেগ দিয়ে চলে না; রাষ্ট্র চলে সংবিধান, আইন ও কানুন দিয়ে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন সংক্রান্ত কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। অথচ গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা এই আদেশটি কোনো অধ্যাদেশ নয়, আবার কোনো আইনও নয়; এটি একটি অদ্ভুত বিষয়। এই আদেশের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়া এবং রাষ্ট্রপতির কাছে অধিবেশন আহ্বানের দাবি অসাংবিধানিক।

গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটে জনগণের রায়কে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আদেশের মাঝখানে জবরদস্তিমূলকভাবে এমন কিছু প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা জুলাই সনদের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ ছিল না। চারটি ভিন্ন প্রশ্নের জন্য একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা যৌক্তিক ছিল না। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংস্কার পরিষদের শপথ বা অন্যান্য বিষয় আসবে।

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, বিএনপি বারবার জাতির সামনে পরিষ্কার করেছে যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদে যেসব বিষয়ে তারা একমত হয়েছে এবং যার ভিত্তিতে স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। আর যেসব বিষয়ে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলো নিয়ে সংসদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। সবে সরকার গঠিত হয়েছে; তাৎক্ষণিকভাবে একে ফরজ দায়িত্ব হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যদি বলা হয় বিলম্ব হলে মানব না, তাহলে বুঝতে হবে বিলম্ব শব্দটির পেছনে কোনো প্রলম্বিত উদ্দেশ্য রয়েছে।

দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান স্বচ্ছ ও স্পষ্ট। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে জুলাই সনদে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে, সেখান থেকে তারা একচুলও সরবে না। আর যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি হওয়ার সময়ই তারা বলেছিলেন যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। কারণ, তারা একভাবে স্বাক্ষর করেছে, অথচ সরকার ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে। যেসব বিষয়ে তারা একমত হয়নি, সেগুলো কেন সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংযুক্ত করা হবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি কোনো চাপে নেই। বরং বিরোধী দল যা বলছে, তা দেশে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার পরিকল্পনার অংশ বলেই তাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। একটি নতুন সরকার সবে গঠিত হয়েছে, এখনই সময় বেঁধে দেওয়া সমীচীন নয়। তারা বাস্তবিক কথাই বলেছিল—সংসদ শুরুর দুই বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এখন বলা হচ্ছে, এক মাসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে। এভাবে তারিখ বেঁধে দিয়ে কোনো কিছু হয় না। আগে রাষ্ট্র চালাতে হবে, জনগণকে বাঁচাতে হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারও রয়েছে এবং সেটি এরই মধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদে দলিলটি তারা বাস্তবায়ন করবে, তবে তার জন্য সময় লাগবে। আলাপ-আলোচনা হলে একটি পদ্ধতি বের হয়ে আসতে পারে, সেই পথও খোলা রাখা হয়েছে।

প্রিন্স বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের জনপ্রিয়তা নির্ভর করছে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেল সংকট মোকাবিলা করা, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যক্রম, খাল খননসহ নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখার ওপর। জনগণের প্রত্যাশাও এসব বিষয়কে ঘিরে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে গণআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে মাথায় রেখেই বিএনপি সরকার কাজ করছে। তবে একদিনে সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে অহেতুক চাপ সৃষ্টি না করে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও অভিমত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট, যা তারা প্রায় দেড় বছর আগে জানিয়েছে। ফলে এ বিষয়ে জনগণের সঙ্গে দলটির কোনো প্রতারণা নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বিএনপি শুরুতেই তার অবস্থান স্পষ্ট করেছিল—তারা কী করতে চায় এবং কী করতে চায় না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ৩১ দফার আলোকে যেসব বিষয়ে তারা একমত হয়েছে, সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। আর যেসব বিষয়ে একমত হতে পারেনি, সেগুলোতে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিরোধিতা করেনি এবং বলেনি যে, তারা এই আদেশ মানবে না। সে কারণে কোনো জনঅসন্তোষ তৈরির কারণ নেই। বরং ঐকমত্য কমিশন অনৈক্যের ভিত্তিতে হ্যাঁ-না ভোট করতে গিয়ে বর্তমান জাতীয় সংকট তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, বিএনপি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে সংশোধন করে অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ার কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কার্যকর করতে কিছু সীমাবদ্ধতা ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেগুলো সংশোধন করে তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রায় দেড় বছর আগেই বিএনপি তাদের এই অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ফলে দলটি কোনো প্রতারণা করছে না। বিএনপি ৩১ দফার আলোকে যেসব বিষয় ধারণ করে, সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে পারে। অন্য বিষয়গুলো অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে এসেছে, সেগুলোর দায় বিএনপির নয়।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করেছে—যেগুলোতে রাজনৈতিক মতৈক্য হয়নি। এরপর সেগুলোকে নতুন করে হ্যাঁ-না ভোটে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রশ্নগুলোতে রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। যার ফলে সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কেন্দ্র করে আজকের এ ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এটি বিএনপির দায় নয়; দায় হলো ঐকমত্য কমিশনের।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গুলিতে নিহত বাংলাদেশির মরদেহ হস্তান্তর করল বিএসএফ

তিন পজিশন নিয়ে স্কালোনির সংশয়, কেমন হবে আর্জেন্টিনার একাদশ

তাবলীগ জামাতের বয়ান নিয়ে দুপক্ষের তুমুল সংঘর্ষ

আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনের দিনক্ষণ জানাল ইরান 

বাংলাদেশ-জাপান ক্যারিয়ার সেন্টারের যাত্রা শুরু

দেলোয়ার হোসাইন খানের কবিতা : দীপাঞ্জলী

জনগণের রায় না মানলে সেটি জনগণের সরকার হতে পারে না : জামায়াত আমির

প্রথম ম্যাচেই নিয়ম মানেনি মার্কিন ব্রডকাস্টার

বাজেট উপস্থাপনের পর নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি : প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

১০

সরকারি ফান্ড কীভাবে অপচয় হচ্ছে, জানালেন প্রতিমন্ত্রী নুর

১১

রোববার হচ্ছে না ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি

১২

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে ছোট্ট ওকেয়া, ‘মাকে এনে দাও’

১৩

মেধাবী প্রকৌশলীদের দেশের কাজে লাগানোর আহ্বান আইনমন্ত্রীর

১৪

সিলেটকে পরিবেশবান্ধব সবুজ নগরী গড়ে তুলব : সিসিক প্রশাসক

১৫

চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ

১৬

আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী

১৭

গুণীজনদের জীবদ্দশায় সম্মান জানালে সমাজসেবায় উৎসাহ বাড়বে : মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী

১৮

বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে ছাত্রদলের আনন্দ মিছিল

১৯

ডেপুটি স্পিকার নেতৃত্বাধীন সংসদীয় দল ঢাকায় ফিরেছেন

২০
X