

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনের সান্নিধ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আর মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। যখন প্রতিটি ঘরে উৎসবের আলো জ্বলার কথা, তখন কোথাও কোথাও জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন। শহর থেকে যে মানুষগুলো একটু শান্তির খোঁজে গ্রামে ফিরছেন, তাদেরও পিছু ছাড়ছে না অপরাধের দীর্ঘ ছায়া। খুনের মিছিল আর ছিনতাইয়ের আতঙ্ক এখন কেবল ইট-পাথরের শহরেই আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়ছে সবুজ গ্রাম-গঞ্জেও। রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর ঘিরে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল দফায় দফায় উদ্যোগ। মাঠ পর্যায়ে কড়া নির্দেশনার পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছিল নজরদারিও। কিন্তু পুলিশের হুঁশিয়ারি-উদ্যোগের মধ্যেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর কিংবা একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে থামানো যায়নি খুনোখুনি। সঙ্গে চুরি থেকে ছিনতাই-সবই হচ্ছে থেমে থেমে। হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা করছে না অপরাধীরা। এমনকি খোদ পুলিশ প্রধানের (আইজিপি) গ্রামের বাড়িতেই গত সোমবার রাতে ঘটল চুরির ঘটনা, যা দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু গত দুই মাসেই দেশে ৬৩৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার বড় একটি অংশই পুলিশের ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কেবল ঢাকা মহানগরেই প্রতি দুই দিনে গড়ে একজন মানুষ খুন হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এসব ঘটনার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাকে দায়ী করলেও অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে গ্রাম-গঞ্জে সংঘাত ও খুনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তড়িৎ ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সচেতনতা এখন সময়ের দাবি।
গত দুই সপ্তাহে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, ছড়িয়েছে আতঙ্কও। চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। যদিও পুলিশ বলছে, সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। আগামভাবে পুলিশের পক্ষে এসব অপরাধ ঠেকানো পুরোপুরি সম্ভব না হলেও ঘটনায় জড়িতরা গ্রেপ্তার হচ্ছে দ্রুততম সময়েই।
অবশ্য সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঈদের ছুটিতে এ ধরনের সংঘাত ও খুনোখুনির সংখ্যা বাড়তে পারে গ্রাম-গঞ্জেও। এজন্য পুলিশি কার্যক্রমের সঙ্গে তারা সামাজিক দায়িত্ববোধের দিকেও তাগিদ দিয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের গত দুই মাসের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৬৩৭টি মামলা হয়। এরমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই শুধু সারা দেশে ২৫০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এসব খুনোখুনিতে এগিয়ে আছে ঢাকা মহানগর ও পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলো। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শুধু ঢাকা মহানগরেই খুনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৩৭টি। এসব ঘটনার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড হয়। অর্থাৎ প্রতি দুই দিনে একটি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মহানগরে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন ১৩টি জেলায় খুনের মামলা হয় ১৩০টি। এরমধ্যে শুধু ফেব্রিুয়ারি মাসেই ওই ১৩ জেলায় ৫৭ হত্যাকাণ্ড ঘটে। খুনোখুনিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জের জেলাগুলো। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১০ টি খুনের ঘটনা ঘটে।
এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গত রোববার রাতে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে রাকিব আহমেদ নামে এক কলেজছাত্রকে। প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে এমন হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়ালেও পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। যদিও ঘটনার পর লোকজন সিহাব নামে এক তরুণকে আটক করে পুলিশে দেয়।
এর আগে গত শনিবার দিনেদুপুরে এক লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পল্লাইন্যা কাটা এলাকায় সন্ত্রাসীরা গণেশ পাল (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে। জেলা শহরের পৌরসভার সমবায় মার্কেটে তার কাপড়ের দোকান রয়েছে। ওই ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও ব্যবসায়ী ও সংখ্যালঘু পরিবারটির মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে এখনও।
গত ১১ মার্চ রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের মশারখোলা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে জদিদা কাওসার নামে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এর দুইদিন পর ১৩ মার্চ পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে ইট ভাটার পাশ থেকে গোপাল চন্দ্র দাস নামে একজনের মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
গত রোববার খুলনার পাইকগাছায় বাড়ির পুকুর থেকে ভারতী মণ্ডল (৫৫) নামে এক নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা লাশ উদ্ধারের আগের রাতে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে ওই নারীকে হত্যার পর মরদেহ পুকুরে ফেলে যায়। নিহত ভারতী মণ্ডলের ছেলে চিন্ময় মণ্ডল বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত রয়েছেন।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কলহ, জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুধু এই হত্যাকাণ্ডই নয়, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে ৩ শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সারা দেশে ১৩৪ টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ও ৪২টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়। এসব ছিনতাইয়ের মধ্যে অন্তত ২২টি মামলা হয় ঢাকা মহানগরের থানাগুলোতে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে চুরির ঘটনায় মামলা হয় এক হাজার ৪৬২ টি। এরমধ্যে ৬৩৪টি মামলা হয় শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই। যদিও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলার ভিত্তিতে পুলিশ পরিসংখ্যান তৈরি করলেও বাস্তবে চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা আরও বেশি হয়। বেশির ভাগ সময়ে পুলিশ ছিনতাই হলেও হারানো জিডি বা চুরির মামলা নিয়ে থাকে। আবার অনেকে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে বা চুরির শিকার হয়ে আইনি ঝামেলা এড়াতে থানাকেও অবহিত করেন না।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে আগামী কয়েক দিন ফাঁকা রাজধানী বা শহরগুলোতে ছিনতাই-হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ কম হলেও চুরির মতো ঘটনা বাড়তে পারে। তবে গ্রামে-গঞ্জে নানা ধরনের সংঘাত-সহিংসতা বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে শহর থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে ফিরলে পুরনো বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। এতে গ্রামাঞ্চলে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে। ছুটির সময়ে স্থানীয় বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে সংঘর্ষ বেশি দেখা যায়, যা কখনো কখনো হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে গ্রামে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে, একই সঙ্গে পুরনো দ্বন্দ্বও সামনে আসে। প্রশাসন যদি আগাম নজরদারি না বাড়ায়, তাহলে গ্রামাঞ্চলে সহিংসতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এখন তো দেশে নির্বাচিত সরকার আছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও তাদের নিজ নিজ এলাকায় ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর সময় এ ধরনের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানাতে পারেন। সেই সঙ্গে যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে, তাদের গ্রেপ্তারের পরে যেন দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।’
সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশের খুনোখুনি ও ঈদের সময় উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে এবং ঈদের ছুটিতে যেগুলো ঘটে থাকে বা ঘটার আশঙ্কা আছে, সেগুলো পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা। এ ধরনের সমস্যাগুলোতে পুলিশের আগে থেকে তেমন কিছু করার থাকে না। তবে আমরা এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করেছি এবং সামনে যারা এসব করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে দ্রুতই।’
ঈদকেন্দ্রিক নানা অপরাধ ঠেকানোর বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে আমাদের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সব সময়ে তৎপর। এসব মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থাও। এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণেই আছে বলে আমরা মনে করি।’