রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশের দিন থেকে শুরু করে এক দিনের হরতাল ও তিন দফায় ৯ দিনের অবরোধে সারা দেশে অন্তত ২৪১টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা বেশি ঘটেছে। বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর এই হরতাল-অবরোধে যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ি, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ ভ্যান, পুলিশের গাড়ি এবং মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে ওই দিন দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় সাতটি যানবাহনে। এর মধ্যে পুলিশ হাসপাতাল কম্পাউন্ডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সসহ ১২টি অ্যাম্বুলেন্সে। সেখানে পুলিশের তিনটি জিপসহ পাঁচটি গাড়ি এবং ২৩টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। শান্তিনগর মোড়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের সাতটি মোটরসাইকেল। ওই দিন রাজধানীতে বাস, পিকআপ, কাভার্ডভ্যানসহ আরও ২০টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানান, ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৩ দিনে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে ৯২টি বাস-মিনিবাসে অগ্নিসংযোগ ও দুই শতাধিক বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামীতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে গাড়ি চলাচলে যেন কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি না হয়, এজন্য ঢাকাসহ জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক সামদানি খন্দকার স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আগামীতে বিএনপি-জামায়াত নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে ঢাকাসহ সারা দেশে বাস-মিনিবাস চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সমিতি ও কোম্পানিভুক্ত মালিক-শ্রমিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মসূচি দিয়ে মানুষকে আতঙ্কে রাখতে বিএনপি নেতাকর্মীরা এসব অগ্নিসংযোগ করছে। এরই মধ্যে নির্দেশদাতাসহ হাতেনাতে অনেক অগ্নিসংযোগকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কোনো ঘটনাতেই বিএনপি বা সমমনাবিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের অগ্নিসংযোগের দায় স্বীকার করা হয় না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন্স) বিপ্লব কুমার সরকার কালবেলাকে বলেন, রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নিয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য নেই। কর্মসূচির নামে নাশকতা করলে, জ্বালাও-পোড়াও করলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। তিনি বলেন, যারা যানবাহনে আগুন দিচ্ছে, তাদের অনেককেই হাতেনাতে ধরা হয়েছে। এ ধরনের নাশকতার নির্দেশদাতাদেরও গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছে।
ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২৮ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনে সারা দেশে মোট ৮২টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৮ অক্টোবর ২৯টি, পরের দিন ১৯টি, ৩০ অক্টোবর একটি, ৩১ অক্টোবর ১১টি, ১ নভেম্বর ১৪টি, ২ নভেম্বর ৮টি যানবাহনে আগুন নেভান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। এ ছাড়া ৩১ অক্টোবর মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে ২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৩৪টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাজধানীতেই ১২টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ৪ নভেম্বর শনিবার রাত থেকে ৫ নভেম্বর রোববার ভোর পর্যন্ত ১২টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকায় সাতটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ৫ নভেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারা দেশে ২১টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে পোড়ানো হয় ১২টি গাড়ি। ৮ নভেম্বর বুধবার ভোর ৬টা থেকে ৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৩টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে সাতটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম কালবেলাকে বলেন, এসব অগ্নিসংযোগের মধ্যে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত বেশি ঘটেছে। ২৮ অক্টোবর রাতে রাজধানীর ডেমরায় বাসে দেওয়া আগুনে একজন দগ্ধ হয়ে নিহত হন।
এ ছাড়া গতকাল রাত সোয়া ১১টার দিকে মিরপুরে ট্রান্স সিলভা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। কল্যাণপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি স্টেশন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।