মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০১:৫৯ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অটোমেশনে হযবরল

বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি
অটোমেশনে হযবরল

বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো এ বছর প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে অটোমেশন চালু করায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। এতে তারা হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। নতুন নীতির কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আগে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারতেন।

সংশ্লিষ্টদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যে প্রথমবারের মতো এ অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়। এতে প্রথমে শিক্ষার্থীদের ৫টি মেডিকেল কলেজে ভর্তির চয়েস রাখা হয়। পরে এই নীতি পরিবর্তন করে ছেলেদের জন্য ৬০টি মেডিকেল কলেজ এবং মেয়েদের জন্য ৬৬টি চয়েস রাখা হয়। এদিকে অটোমেশন সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আপত্তির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ)। অটোমেশন চালু হলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আসন শূন্য থাকার শঙ্কা রয়েছে বলে দাবি তাদের।

তবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এই দাবি মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্যমতে, অটোমেশন ভর্তি প্রক্রিয়ায় মেধার মূল্যায়ন হবে। সেইসঙ্গে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। যেভাবে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা রয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তিচ্ছু মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ৬ হাজার ৩৫৪ জন। এর মধ্যে নিজ অর্থায়নে ভর্তিচ্ছু ৪ হাজার ৭৮৩ জন এবং অসচ্ছল ও মেধাবী কোটায় ভর্তিচ্ছু ১ হাজার ৩৬০ জন।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তৈরি ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের তালিকায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা ঢাকার বাইরে গ্রামে-গঞ্জের কোনো মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। যেখানে মানিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য। আবার মফস্বলের অনেকে রাজধানীতে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এখানকার ব্যয় বহন তাদের পক্ষে কঠিন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই নীতি মেডিকেল শিক্ষা ধ্বংসের নামান্তর।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, অটোমেশন পদ্ধতি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অটোমেশন নয়, প্রচলিত নীতিমালা শিক্ষার্থীবান্ধব। যারা ঢাকার বাইরে থাকেন, তাদের যদি অটোমেশনে ঢাকায় ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে থাকা-খাওয়ার বাড়তি খরচ জোগান দিতে হয় অভিভাবকদের। অন্যদিকে যিনি ঢাকা থেকে বাইরে যাবেন, তাকেও একই হয়রানির শিকার হতে হবে। তাই প্রচলিত পদ্ধতিতে ভর্তি হলে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে উভয়ই।

বিষয়টিতে উদ্বেগ জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী বরাবর লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছে বিপিএমসিএ। সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, এবার বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তিতে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ১৮ জুন ১০০ টাকা জমা দিয়ে ভর্তির প্রাথমিক নিশ্চায়নের শেষ দিনে মাত্র তিন হাজার ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী নিশ্চিত করেছেন। এতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আসন শূন্য থাকতে পারে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় অনলাইনে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় মেধা ও পছন্দের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার্থী নির্বাচিত হন। এতে প্রকৃত মেধা মূল্যায়িত হয়, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং কারও কোনো অভিযোগ থাকে না। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি প্রক্রিয়া অনলাইনে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় শুরু হওয়ায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পথ বন্ধ হয়েছে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চিতকরণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।

বিপিএমসিএ সভাপতি এম এ মুবিন খান কালবেলাকে বলেন, কোনো দেশে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি সরকার করে দেয়—এমন নজির নেই। যেটা সবচেয়ে বেশি কনফিউশন তৈরি করছে সেটা হচ্ছে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কথা হচ্ছে, আমি আমার টাকা দিয়ে পড়ব। যেখানে ইচ্ছে সেখানে পড়ব। একজন পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকে, আমি তাকে দিয়ে দিচ্ছি চট্টগ্রামে বা রংপুরে। তখন কিন্তু সে মেডিকেলে পড়ার আগ্রহ হরিয়ে ফেলছে। আমরা সরকারকে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলেছি, ভর্তিতে আগে যে প্রক্রিয়া ছিল সেটাকে ফের বহাল রাখতে হবে। তাহলে কনফিউশন দূর হবে। হয়রানি বন্ধ হবে। ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কোথাও কোনো অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে বিএমডিসি, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনিটরিং করার জন্য রয়েছে। তারা ব্যবস্থা নেবে। কেউ যদি অন্যায় করে তার জন্য সবার জন্য অটোমেশন চালু করতে হবে? তাহলে রেগুলেটরি বডির কাজ কী?

মুবিন খান আরও বলেন, গত ১৮ জুন দেখা গেছে, তিন হাজারের কিছু বেশি কনফার্ম করেছে ১০০ টাকা দিয়ে। এর পর নিশ্চয়তার দিনে আরও কয়েকশ কনফার্ম করেছে। কিন্তু সব মিলিয়ে সিট আছে ৬ হাজারের কিছু বেশি। এদিকে তারা আবেদন সিলেক্ট করেছে ৬ হাজার ৩২০ কিংবা তার সামান্য বেশি। এর মধ্যে এক হাজার ৬০০ হচ্ছে অসচ্ছল এবং মেধাবী আছে। তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে সাড়ে চার হাজার ভর্তি হতে পারবে। বেসরকারি মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তি বিষয়ে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নতুন নীতিমালায় ছিল, একটি আসনের বিপরীতে পাঁচজনকে সিলেক্ট করবে। সেখান থেকে ভর্তি হবে। কিন্তু এখন তো একটি আসনের বিপরীতে একজন হচ্ছে না। তাহলে উনারা কীভাবে সিলেক্ট করবেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞা কালবেলাকে বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজে তো অটোমেশনে ভর্তি হচ্ছে। এতে তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সবাই ভর্তি হতে পারেছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এখন তারা অটোমেশন প্রক্রিয়ায় ভর্তি শুরু হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন। ব্যাপারটা তো ওরকম নাও হতে পারে, তাই না? প্রাইভেট মেডিকেলেও অটোমেশন প্রক্রিয়ায় সবাই ভর্তি হতে পারবে। কিছু যদি সমস্যা হয় সেটাও পূরণ করার জন্য একটা সিস্টেম ডেভেলপ করার চিন্তা করছি। প্রয়োজনে আমরা আবার সেকেন্ড রাউন্ড চিন্তা করব, যাতে আসনগুলো পূরণ হয়। অটোমেশন প্রক্রিয়ায় যদি সব আসন পূরণ হয়ে যায়, তাহলে তো কোনো অভিযোগ থাকবে না।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, আগের ভর্তি প্রক্রিয়ায়ও কিন্তু অনেক আসন ফাঁকা থেকেছে। অতীতে অভিযোগ পেয়েছি যার ৭ হাজার সিরিয়াল সে ভর্তি হতে পারেনি। কিন্তু ৭০ হাজার সিরিয়ালের শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। অটোমেশনের আগে মেধার চেয়ে টাকা বেশি মূল্যায়ন হয়েছে। অনেক মেডিকেল কলেজের মালিক আসন ফাঁকা থাকার পরও ভর্তি বন্ধ রেখে পরে পেছন থেকে সিরিয়ালের শিক্ষার্থীদের বেশি টাকার বিনিময়ে ভর্তি করিয়েছেন। অনিয়মের অভিযোগ এসেছে বলেই তো অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। আমরাও চাই শিক্ষার্থীরা যেন নিগৃহীত না হয়। যে প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি সেখানে মেধারও মূল্যায়ন হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জীবনের প্রথম খিঁচুনি কি ক্যানসারের লক্ষণ? যা বলছে গবেষণা

ফৌজদারি অপরাধে দণ্ড নির্ধারণে অভিন্ন মানদণ্ড চায় আইন কমিশন

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস ডিপার্টমেন্টে এআই নিয়ে ২ দিনের কর্মশালা

সুইস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন আব্বাস আরাগচি

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শুরু

১০০০তম বিশ্বকাপ ম্যাচ: সংখ্যার আড়ালে লুকানো চমকপ্রদ তথ্য

‘তারেক রহমান বিদেশনীতিতে নাহিদ ইসলামের পথ অনুসরণ করছেন’

যুবককে পিটিয়ে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা, পুলিশের গাড়ি অবরুদ্ধ

কোরবানির হাটে অবিক্রিত সেই ভাইরাল উট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত 

দোকান ভাড়ার বিরোধে ব্যবসায়ী খুন, আসামির যাবজ্জীবন

১০

রাতের মধ্যে ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে যেসব অঞ্চলে

১১

সমঝোতার প্রথম ধারা যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে পারেনি : ইরান

১২

পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ

১৩

যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা মামলার আসামি পাহাড় থেকে গ্রেপ্তার

১৪

গুলি করতে করতে হেঁটে যাচ্ছেন যুবক, ভিডিও ভাইরাল

১৫

ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে যেখানে পদায়ন করল সরকার

১৬

জাতীয় কবির দর্শন ছড়িয়ে দিতে ‘নজরুল বর্ষ’ পালনের সিদ্ধান্ত

১৭

স্কুলশিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগ, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সড়ক অবরোধ

১৮

অস্ট্রেলিয়ার কাছে ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’ টাইগারদের

১৯

মীর শাহে আলম ও জনতুষ্টিবাদ

২০
X