রাজনীতির মাঠে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে জাতীয় পার্টি। সারা দেশেই কমছে সাংগঠনিক শক্তি। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার মতো রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিও নেই দীর্ঘদিন। নির্বাচনে নিয়মিত হলেও সেখানেও মিলছে না সাফল্যের দেখা। তৃণমূল থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত সব স্তরেই দলটির জনপ্রতিনিধির সংখ্যা একবারেই হাতেগোনা। একসময় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলেও নেই আগের অবস্থা। সব মিলিয়ে সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের গড়া জাপার রাজনীতিতে চরম দুর্দিন চলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
দলটির সাবেক ও বর্তমান নেতাসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো, দফায় দফায় ভাঙন, একক নেতৃত্বে দল পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকাই জাপার দুর্গতির মূল কারণ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আরও টুকরো টুকরো হয়ে নামমাত্র দলে পরিণত হবে জাপা। তবে বিভক্তি কাটিয়ে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারলে মাঝারি শক্তির দল হিসেবে রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
দলীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু কালবেলাকে বলেন, ‘রাজনীতিতে ভাঙা-গড়ার খেলা শুধু জাপায় নয়, অন্য দলগুলোতেও আছে। আমরা জাপাকে শক্তিশালী করতে কাজ করছি, সংসদে কম আসন মানেই দল দুর্বল—এমনটা ভাবার কারণ নেই। সদস্য সংখ্যায় কম হলেও সংসদে কী ভূমিকা পালন করছি, মানুষের কথা বলছি কি না—সেটাই বড় বিষয়।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯০ সালে এইচ এম এরশাদের সরকারের পতনের পরও তার দল জাতীয় পার্টি (জাপা) বেশিরভাগ সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গেই ছিল। এর পরও ক্রমশ দলটি এতটাই দুর্বল হয়েছে যে, এককভাবে নির্বাচন করার সামর্থ্যও এখন হারিয়েছে। ৩০০ আসনে শক্তিশালী প্রার্থীও দিতে পারে না দলটি। তারা বলছেন, জাপা শুধু দুর্বলই হয়নি, পথও হারিয়েছে। সরকারঘনিষ্ঠ হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা দলটিকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় দলটির তৃণমূল নেতারাও একই বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
১৯৮৬ সালের এক জানুয়ারি জাতীয় পার্টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হন এরশাদ। এরপর জাতীয় পার্টি আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি। রাজনৈতিক নানা বৈরী পরিস্থিতির মুখে দল পরিচালনা করেছেন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। নিজেও জেল খেটেছেন। তবে টানা তিন মেয়াদে বিরোধী দলের আসনে আছে জাপা। বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সুসময় পার করছে জাতীয় পার্টি।
কিন্তু সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে রাজনীতি করলেও গত ১৫ বছরে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বাড়েনি জনসমর্থনও। জনস্বার্থে পার্টির তৃণমূল পর্যন্ত কোনো কর্মসূচিও নেই। টানা তিনবার জাপা বিরোধী দলে থাকলেও কোনো ইস্যুতেই রাজপথে জাপার কোনো আওয়াজ নেই। ছোট দলগুলো যখন রাজপথে কর্মসূচির পরিচালনা করছে, তখনো দলটির কার্যক্রম বনানী চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘিরেই সীমাবদ্ধ। কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় খোলা হয় না অনেকদিন। এখানে কেউ আসেনও না।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের একাধিক উপদেষ্টা ও প্রেসিডিয়ামের সদস্য কালবেলাকে বলেন, ধারাবাহিক ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে থেকে জাপা এখন গৃহপালিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জনসমর্থন হারানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দলটি গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পার্টির আন্তর্জাতিক সেলও কার্যত নিষ্ক্রিয়। ৩০০ সংসদীয় আসনে কত ভোট রয়েছে, তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই। নেতাকর্মীরা দিন দিন হতাশ হয়ে অন্য দলে যোগ দিচ্ছেন বলেও জানান তারা।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন, ১৯৯০ সালের পর জাতীয় পার্টি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার দলে সরকারি দলের এজেন্ট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
সাত দফা ভাঙন:
এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ভেঙে জন্ম নিয়েছে জেপি, বিজেপি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি নামের তিনটি নিবন্ধিত দল। জাতীয় পার্টি (জাফর) নামের আরেকটি অনিবন্ধিত দল সক্রিয় রয়েছে। অতীতে সক্রিয় ছিল জাতীয় পার্টি (জা-মো) এবং জাতীয় পার্টি (না-ফি) নামের দুটি অংশ। সর্বশেষ গত ৯ মার্চ রওশন এরশাদ সম্মেলন করে নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। ফলে আরেকবার ভাঙন তৈরি হয় জাপায়। এ পর্যন্ত দলটিতে যত ভাঙন হয়েছে সর্বশেষ ভাঙনটি সবচেয়ে ক্ষতির কারণ বলেও মনে করেন দলের নেতারা। তারা বলছেন, ঘরের ভেতরে অর্থাৎ দেবর-ভাবির মধ্যে ভাঙনে সারা দেশে দল বিভক্ত হয়েছে। বারবার ভাঙনে দলের ভিত নষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন জাপা নেতারা।
ভাঙন প্রসঙ্গে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের সম্প্রতি বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দল ভাঙার চেষ্টা করে। জাতীয় পার্টির বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সঠিক রাজনীতি করতে গেলেই সরকার বারবার দল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’
সংসদে আসন কমছে, ভূমিকাও দুর্বল:
এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে জয়লাভ করে জাপা। এর দুই বছরের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের বর্জন করা ওই নির্বাচনে জাপা ২৫১টি আসনে জেতে।
ওই সংসদের মেয়াদ পেরোনোর আগেই নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পায় ৩২টি। ২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জোট করে জাতীয় পার্টি পায় মাত্র ১৪ আসন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে ২৭টি; ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও জাতীয় পার্টি পায় ৩৪টি আসন। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে সেটি আরও কমে দাঁড়ায় ২২-এ। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬টি আসনে সমঝোতা করেও ১১টির বেশি জিততে পারেনি জাতীয় পার্টি।
নিজেদের ঘর হিসেবে পরিচিত রংপুরসহ গোটা উত্তরের জনপদে জাপার অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। রওশনপন্থি নেতা রংপুর-১ আসনে মসিউর রহমান রাঙ্গা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরেছেন। এ ছাড়া রংপুর-২, ৪, ৫ ও ৬ আসনেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। গাইবান্ধায় হেরে গেছেন জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারীর মতো আলোচিত প্রার্থী। জামানত হারিয়েছেন জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরীফা কাদেরসহ বেশিরভাগ প্রার্থী।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরেও জাপার জনপ্রতিনিধি সংকট চরমে উঠেছে। চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলটি প্রার্থী পাচ্ছে না। প্রথম দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের কেউ পাস করতে পারেননি। সব মিলিয়ে সারা দেশে স্থানীয় সরকারে দলটির জনপ্রতিনিধির সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। অবশ্য রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয়লাভ জাপার বড় অর্জন।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টি (রওশন) নির্বাহী সভাপতি কাজী ফিরোজ রশীদ কালবেলাকে বলেন, ‘সবার মতামত নিয়ে দল পরিচালনা না করলে ভাঙন ঠেকানো যায় না। কারও একক ইচ্ছায় দল পরিচালনা হলে এর পরিণতি শুভ হয় না। যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ জাতীয় পার্টি। দলটি দিন দিন রাজনীতিতে দুর্বল হচ্ছে। আমরা নতুন করে জাগানোর চেষ্টা শুরু করেছি।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী কালবেলাকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সরকারে থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চায়। সাধারণ মানুষ এটি মোটেও গ্রহণ করে না। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টির কাছে মানুষের তেমন কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। আস্তে আস্তে নামসর্বস্ব দলে পরিণত হবে জাতীয় পার্টি।’