

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) সহকারী পরিচালক আকরাম হোসেন। ১৯৮৯ সালে নিম্নমান সহকারী হিসেবে এনএসআইতে যোগ দেন। আট বছর পর বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে জুনিয়র ফিল্ড অফিসার হন। ২০১৬ সালে পদোন্নতি পান সহকারী পরিচালক পদে। এর পর থেকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার জীবনের গতিপথ। ২০২০ সালে আকরাম ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে আকরাম হোসেনের স্ত্রীর ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ১২৬ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পায় সংস্থাটি। যার মধ্যে ১২৫ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে এসব টাকা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় গেছে, তার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি দুদক।
তবে দুদক ধারণা করছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আকরাম কিংবা তার পরিবারের নয়। আকরাম ও তার স্ত্রী শুধু বাহক হয়ে এসব টাকা সংগ্রহ করে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আর্থিক লেনদেন হয়েছে মূলত আটটি ব্যাংকের ২৫টি হিসাবের মাধ্যমে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের চারটি হিসাবে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে ৭৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৫৫ টাকা। একই সময়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৭৬ কোটি ৬৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৬ টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংকের ছয়টি হিসাবে ২০১০ সালের ১ এপ্রিল থেকে জমা হয়েছে ১০ কোটি ৬৯ লাখ ৯৩ হাজার ২৬৭ টাকা। একই সময়ে
তুলে নেওয়া হয়েছে ১০ কোটি ৩৯ লাখ ৬৭ হাজার ৬৮৯ টাকা। সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০১৯ সালের ৩ জুলাই থেকে জমা হয়েছে ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার ৯২১ টাক। একই সময়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮২৮ টাকা। ইসলামী ব্যাংকের তিনটি হিসাবে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত জমা হয়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৪ টাকা। একই সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৮৫ হাজার ৪১২ টাকা। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুটি হিসাবে জমা হয়েছে ২০১১ সালের ৮ মে থেকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৬ টাকা। একই সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯৭৭ টাকা। উত্তরা ব্যাংকের দুটি হিসাবে ২০১১ সালের ২২ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭৫ টাকা। একই সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা। পূবালী ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত জমা হয়েছে ১১ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার ১২৪ টাকা। একই সময়ে উত্তোলন করা হয়ছে ১১ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার ১২৪ টাকা। ইউসিবি ব্যাংকের ছয়টি হিসাবে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত জমা করা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮ টাকা।
আটটি ব্যাংকের ২৫টি হিসাবের প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেছে কালবেলা। এসব লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টাকার বড় একটি অংশ জমা হয়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা থেকে। এর মধ্যে সীমান্ত এলাকা থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ জমা হয়েছে। আর এসব টাকা উত্তোলন করা হয়েছে রাজধানীতে। রহস্যজনকভাবে অর্থ জমা হওয়ার দু-এক দিনের মধ্যেই তা নগদ উত্তোলন করা হয়। বছরব্যাপী ছোটখাটো লেনদেন থাকলেও সর্বশেষ তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে সবচেয়ে বেশি আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তবে এসব টাকা কে বা কারা পাঠিয়েছে এবং তা কোথায় কার কাছে গেছে, তার কোনো হদিস পায়নি দুদক। তবে দুদক সূত্রে জানা গেছে, আকরাম দুদককে বলেছেন, এসব অর্থ তার স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যবসায়িক লেনদেনের। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
এসব বিষয়ে জানতে আকরাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। এরপর মেসেজ পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া একটি নথিতে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে আকরাম হোসেন তার স্ত্রী ও ছেলের ব্যবসা করার অনুমতি চেয়ে এনএসআইর পরিচালক (প্রশাসন) বরাবর একটি আবেদন করেন। তবে সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। দুদকে জমা দেওয়া নথিতে আকরাম তার স্ত্রীর নামে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য দিয়েছেন সেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করেন আকরাম নিজেই। আবার এনএসআইয়ে দেওয়া আবেদনে আকরাম বলেছেন, এসব ব্যবসার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
নথিপত্র থেকে জানা যায়, আকরাম হোসেনের ছেলে মো. তানভীর হোসেন ২০১৮ সালের দিকে ‘স্টার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনিই সেই ব্যবসা বন্ধ করে দেন। এ ছাড়া আকরামের স্ত্রী সুরাইয়া পারভীন দুদকে জমা দেওয়া নথিতে ২০০৯-১০ করবর্ষে ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ দেখিয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা আয় দেখালেও ওই সময়ে তার কোনো আয়ের উৎস ছিল না। ব্যাংক হিসাবে থাকা ১২৬ কোটি টাকা লেনদেন হলেও ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সুরাইয়া ব্যবসা থেকে মাত্র ৩ কোটি ৮১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৩২ টাকা আয় করেছেন বলে দুদকে জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখ করেছেন।
দুদক গত ২১ মে আকরাম হোসেন ও তার স্ত্রী সুরাইয়া পারভীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দুটি মামলা করেছে। মামলার এজাহারে আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬২ টাকা এবং তার স্ত্রী বিরুদ্ধে মাত্র ২০ লাখ ৯৩ হাজার ৫৫১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘এই মামলাটি
স্বাভাবিকভাবে তদন্ত করা যায়নি। যে কারণে আকরামের স্ত্রীর অ্যাকাউন্টের টাকার হদিস বের করা সম্ভব হয়নি, যা পেয়েছি তা দিয়েই মামলা করেছি। যাতে তদন্ত কাজটি থেমে না যায়।’ দুদকের উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আকরামের অ্যাকাউন্টেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তবে সে অ্যাকাউন্টগুলো এখন ক্লোজ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার ছেলে তানভীরের অ্যাকাউন্টেও লেনদেন হয়েছে। তদন্তে তানভীরের সংশ্লিষ্টতা পেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।’