

২০২৫ সালটি মানব ইতিহাসে বিশ্ব ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তনের ‘সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও জোট ব্যবস্থার মারাত্মক দুর্বলতা—এই দুই প্রবণতাই বছরটি বিশ্বকে কার্যত উল্টে দিয়েছে। কার্যত যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ব্যবস্থার সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপ যেমন বছরটিকে কণ্টকাকীর্ণ করেছে, তেমনি বিজ্ঞানের অগ্রগতি নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের সব আলোচিত সংবাদ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন হুমায়ূন কবির
ট্রাম্পের উত্থান বনাম বৈশ্বিক কম্পন: ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শপথগ্রহণ ছিল বছরের সবচেয়ে আলোচিত সংবাদ। ক্ষমতায় এসে একের পর এক মিত্র দেশের সঙ্গে বিরোধে জড়ান ট্রাম্প। কানাডাকে রাজ্য বানাতে চান, ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডকে দখলে নেওয়ার আগ্রহসহ নানা কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে মেরূকরণ শুরু হয়।
ভূরাজনীতি: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে না পারলেও সমীকরণ বদলে দিয়েছেন ট্রাম্প। গাজায় তার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও শান্তি আসেনি। তার আশকারায় ইউরোপের দেশগুলোতে দক্ষিণপন্থিদের উত্থান ঘটছে। এতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংহতি। যাতে তারা নিজেদের সেনাবাহিনী নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে।
ডলার বনাম বিকল্প মুদ্রা: মার্কিন শুল্কের পাল্টাপাল্টি হিসেবে ইউরোপ ও চীনও শুল্ক বাড়ালে বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো ডলার সংকটে পড়ে। এতে ডলার রাজনীতির প্রভাব ও আস্থা দুটিই হারিয়েছে।
বিলিয়নিয়ারদের স্বর্ণযুগ: ২০২৫ সালটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বিলিয়নিয়ারদের সেরা বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর বিশ্বের ৩৪০ জন নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছেন অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একজন করে শত কোটিপতি তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বে মোট বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪৮ জন, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। নতুন বিলিয়নিয়ারদের উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।
কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে: বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো আন্তর্জাতিক আইন, মুক্ত বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা জোটের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখেনি। বরং শক্তির রাজনীতিকে সামনে এনে দেশটি নিজেই সেই বিশ্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে তুলেছিল।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক পদক্ষেপ নেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদেরও বিস্মিত করে। কানাডা ও ডেনমার্কের মতো মিত্র দেশের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ, ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের আচরণ ছিল আগ্রাসী। এ বছর যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে যুদ্ধ আইন ও মানবাধিকার ইস্যুতে আগের কঠোর অবস্থান থেকেও পিছিয়ে আসে, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে।
চীন ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য: ২০২৫ সাল চীনের জন্য তুলনামূলক স্বস্তির বছর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়, যার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
বিশ্বায়ন ভাঙেনি, বদলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কিছুটা কমলেও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বায়ন চলছে; কিন্তু তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে।
মন্তব্য করুন