

প্রযুক্তিবিশ্বের জন্য ২০২৫ সাল ছিল নানা বিবর্তন ও নতুন নিয়মনীতির জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই বছরের শুরুতেই চীনের ‘ডিপসিকে’র মতো সাশ্রয়ী এআই মডেলের উত্থান যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো বা ডাটা সেন্টার নির্মাণে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। প্রথমবারের মতো তিন ভাঁজের ফোনের বাজারে প্রবেশ করেছে স্যামসাং। পাশাপাশি নিরাপত্তার খাতিরে অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও দেখা গেছে গত বছর।
চীনের এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্টার্টআপ সিলিকন ভ্যালির একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কোম্পানিটির দাবি অনুযায়ী, ডিপসিকের আর১ মডেলটি অন্যান্য প্রতিযোগীর তুলনায় অনেক কম খরচে তৈরি করা হয়েছে। তবে দ্রুত আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি এআই স্টার্টআপটিকে বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াসহ কিছু দেশে ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ চ্যাটবটটি নিষিদ্ধও করেছে সরকার।
ফোর্বসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ বছর ৩৪০ জন নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশের সম্পদ আসে এআই স্টার্টআপ এবং সংক্রান্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, এনভিডিয়ার, ডিপসিক—এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে শুধু সফটওয়্যার নয়, হার্ডওয়্যার, ডাটা সেন্টার এবং নেটওয়ার্কিং খাতেও বিশাল সম্পদ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি অনেককে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এআই সত্যিই এক বিপ্লব। ব্যবসা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন এবং শিল্প—প্রায় সব ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এআই প্রযুক্তির ফলে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের ধারা এতটাই বেড়ে গেছে যে, নতুন উদ্যোগ, স্টার্টআপ এবং নতুন অর্থনৈতিক বাজার গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া তরুণ উদ্যোক্তারা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিলিয়নিয়ারের মর্যাদা অর্জন করছে, যা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের শক্তিকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রদর্শন করছে।
তবে সবকিছু এতটাও সহজ নয়। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলছেন যে, এই এআই উত্থান বুদবুদও হতে পারে। অনেক স্টার্টআপের বাজারমূল্য অতিমূল্যায়িত হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এআইর সম্ভাবনা দেখে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছেন; কিন্তু বাস্তব আয় বা রাজস্ব সেই অনুযায়ী না হলে বাজার হঠাৎ পতনের মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, নীতি-আইন এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালে দেখা গেছে যে, নতুন এআই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে শুধু ধনকুবের তৈরি হয়নি, বরং রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক শক্তিও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফোর্বসের তালিকায় ইলন মাস্ক এবং ল্যারি এলিসনের মতো উদ্যোক্তাদের সম্পদ এক বছরের মধ্যে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির সঙ্গে সঠিক ব্যবসায়িক মডেল এবং বাজার গ্রহণযোগ্যতা থাকলে সম্পদ বৃদ্ধির সীমা নেই।
তবে বাজারের অস্থিরতা, অতিমূল্যায়ন এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এই এআই উত্থানকে বুদবুদে রূপান্তরিত করার ঝুঁকিতে ফেলেছে। অর্থাৎ ২০২৫ সাল এআইকে কেন্দ্র করে একদিকে বিপ্লব দেখিয়েছে—নতুন উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, অন্যদিকে বাজারের অতিমূল্যায়ন এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এটিকে বুদবুদ বানানোর শঙ্কাও তৈরি করেছে।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বাস্তবায়িত হলে এটি বিশ্বের জন্য এক যুগান্তকারী বিপ্লব হবে, না হলে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিপুল ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এ বছর প্রমাণ করেছে যে, এআই কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের দিকেও বিপ্লবী প্রভাব রাখতে সক্ষম।
মন্তব্য করুন