ধরুন, আপনি একটি কারখানা চালাচ্ছেন। সেখানে যদি কাঁচামালের গুণমান খারাপ হয়, যন্ত্রপাতি হয় পুরোনো আর মেশিন চালানোর লোকেরা হয় প্রশিক্ষণহীন—তাহলে সেই কারখানা থেকে কখনো ভালো পণ্য বের হবে না। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকটা সেরকম। শিক্ষার্থী হলো কাঁচামাল, শিক্ষক হলো শ্রমিক আর শিক্ষানীতি হলো সেই মেশিন। যদি একটি উপাদানেও গলদ থাকে, তাহলে জাতি গঠনের এ ‘কারখানা’ থেকে আমরা কেমন মানুষ আশা করব?
বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে নিঃসন্দেহে। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোণে কোণে। কিন্তু মানের যে প্রশ্ন, সেটাই আজ মূল সংকট। আমাদের পাঠদান পদ্ধতি এখনো অনেকটাই পরীক্ষাভিত্তিক, মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থী শেখে যেন পরীক্ষায় পাস করতে পারে, বোঝার জন্য নয়; বাস্তব সমস্যার সমাধান করার জন্য নয়। ফলে তৈরি হচ্ছে সার্টিফিকেটধারী এক প্রজন্ম, যারা চিন্তা করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, শিক্ষার মান সূচকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। একটি জরিপ অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক শেষে দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী গাণিতিক সমস্যা সমাধানে অক্ষম। ইউনেসকো ও ইউএনডিপির এক যৌথ রিপোর্টে দেখা যায়, নীতিমালা যথাযথভাবে প্রণীত হলেও তার বাস্তবায়ন ধীরগতির এবং বেশিরভাগ সময়ই প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকে। পাশাপাশি, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, দুর্বল পাঠ্যসূচি এবং নৈতিক শিক্ষা উপেক্ষিত থাকাও পরিস্থিতিকে দিন দিন সংকটময় করে তুলছে।
শিক্ষানীতিতে ধারাবাহিকতা নেই। প্রতিটি সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতিও পরিবর্তন হয়। শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পান না কিংবা যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা যুগোপযোগী নয়। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন, মুখস্থনির্ভর ও অনুপ্রেরণাহীন। শিক্ষাজীবনের সময়কাল অকারণে দীর্ঘ, কিন্তু কাজের উপযোগিতা কম। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ কম; উদ্যোগ বা কর্মজীবনভিত্তিক শিক্ষা অনুপস্থিত।
শিক্ষাদানের ধরনে যথেষ্ট পরিবর্তন দরকার: তথ্য মুখস্থ করানোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে চিন্তা করতে শেখানোয়। শিক্ষার্থী যেন সমস্যার ধরন বুঝে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নিজেই সমাধান খুঁজে নিতে পারে—এ সক্ষমতা তৈরির দিকেই নজর দিতে হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে: শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, সময়নিষ্ঠা, সহানুভূতির মতো গুণাবলি গঠনের জায়গা হতে হবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভালো মানুষ তৈরি করাও এ ব্যবস্থার বড় উদ্দেশ্য—যেটা শুধু পরিবার নয়, প্রতিষ্ঠানও সমানভাবে শেখাতে পারে।
শিক্ষাজীবনের সময়কাল কমানো দরকার: বর্তমানে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পাস করে, অথচ কর্মজীবনে প্রবেশের পর দেখা যায়—সেই শিক্ষার অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। স্কুলজীবন আট বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা গেলে শিক্ষার্থী দ্রুত আগ্রহ, দক্ষতা এবং ক্যারিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও সংশোধনের যথেষ্ট সময় থাকবে তার হাতে।
শেখাকে শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে মাঠে নিয়ে যেতে হবে: কৃষিকাজ বইয়ে না পড়ে সরাসরি মাঠে গিয়ে শেখাতে হবে—আলু কীভাবে মাটির নিচে জন্মায়, ধান কীভাবে চাষ হয়, গরুর দুধ দোয়ানো কীভাবে হয়। বাস্তবতা স্পর্শ না করলে শেখা গভীর হয় না। উন্নত অনেক দেশেই এভাবে বাস্তবঘনিষ্ঠ শিক্ষা পদ্ধতি চালু রয়েছে।
মো. রিশাদ আহমেদ, শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন