শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য একজন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা। তবে আমাদের সমাজে একটি চিন্তা গেঁথে গেছে, শিক্ষা মানে পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করা। আর ভালো ফল হলেই মানুষ সফল হবে। মানুষকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার ফল দিয়ে, তার আচার-আচরণ বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া দিয়ে নয়।
অথচ বাস্তবতা অন্যরকম, ভালো ফল পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সে নীতিবান, সৎ, দায়িত্বশীল, ন্যায়পরায়ণ—এ নিশ্চয়তা কোথাও নেই। মনুষ্যত্বহীন শিক্ষিত ব্যক্তি কখনো দেশ ও জাতির উন্নতিতে অবদান রাখতে পারে না।
সে ক্ষেত্রে পাঠ্যবই আমাদের পরিপূর্ণভাবে শিক্ষিত করতে পারে না। এটা আমাদের তথ্য দেয়, নিয়ম শেখায়। প্রকৃত শিক্ষা হলো দায়িত্বশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, সচ্চরিত্র ইত্যাদি, যা একজন আদর্শ মানুষের বৈশিষ্ট্য। একজন ছাত্র বইয়ের পাতা থেকে সততার সংজ্ঞা মুখস্থ করতে পারে; কিন্তু বাস্তবে সমাজের সবার সঙ্গে মিশে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, বাস্তবে অনুশীলন করেই সততা শিখতে হয় এবং জীবনে ধারণ করতে হয়। এই গুণাবলি অর্জন করতে হয় পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্পৃক্ততা, বাস্তব অভিজ্ঞতা, আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে। এগুলো পরীক্ষার বই-খাতায় শেখানো হয় না। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট পাওয়ার জন্য তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা ঘুরে বেড়ায় স্কুল, কোচিংয়ের বারান্দায়, প্রতিযোগিতা করে ভালো রেজাল্ট করার, সে প্রতিযোগিতা ভালো মানুষ হওয়ার জন্য নয়। পরীক্ষায় আশানুরূপ সাফল্য না এলে তারা ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ পদক্ষেপ নেয় আত্মহত্যার। তারা মনে করে জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ! অথচ তারা এটা উপলব্ধি করে না, একটা পরীক্ষার রেজাল্ট কখনো জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে না। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য রাত-দিন ডুবে থাকে বইয়ের পাতায়, তারা জানে কীভাবে ভালো ফল করা যায়, কীভাবে জিপিএ ৫ পাওয়া যায় কিন্তু তারা এটা জানে না, কীভাবে প্রতিবেশীর খোঁজ রাখতে হয়, কীভাবে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে, কীভাবে পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া যায়, জানে না কীভাবে অন্যের মতামতকে সম্মান জানাতে হয়। অথচ মানুষকে বিচার করার মানদণ্ড এগুলোই।
পাঠ্যবই আমাদের আক্ষরিক জ্ঞান দান করে, দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে; কিন্তু সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাদের থাকতে হবে সামাজিক জ্ঞান, যেগুলো আমরা পাঠ্যবই নয়; বরং বাস্তব জীবন থেকে পেয়ে থাকি। আমাদের চারপাশে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের খোঁজখবর রাখা, বয়স্ক ব্যক্তিদের থেকে তাদের অভিজ্ঞতা জানা, বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ, বন্ধু বানানো, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করা—এসব মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে, আদর্শ মানুষ হতে সাহায্য করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ মানুষকে অন্যের প্রতি দায়বদ্ধ করে, মানুষের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করে। জীবনের প্রকৃত শিক্ষা এগুলোই যা আমরা বাস্তব জীবন থেকে পেয়ে থাকি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে, তবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। তার ব্যবহারে শিক্ষার ছাপ না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো মূল্য থাকে না। পরীক্ষায় প্রাপ্ত রেজাল্ট হয়তো একদিন ভুলে যাবে; কিন্তু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, সততা, সহমর্মিতা, মানবিক গুণাবলি—এসব একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
আমাদের উচিত পরীক্ষার খাতার চাপ কমিয়ে আদর্শ মানুষ গড়ার শিক্ষায় মনোনিবেশ করা। পরীক্ষায় ভালো করলেই যে জীবনে সফল, এই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দরকার পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞানের অভিজ্ঞতা। কারণ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দরকার সৎ, নির্ভীক, সাহসী ও মানবিক মানুষ—যারা দেশকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে।
কাওসার আহমেদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন