সাকিবুল হাছান
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

ঢাকার বায়ুদূষণ

ঢাকার বায়ুদূষণ

ঢাকা বিশ্বের দ্রুত বর্ধমান শহরগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে শুধু জনসংখ্যার চাপের কারণে নয়, বরং বায়ুদূষণের মাত্রার জন্যও আন্তর্জাতিক মহলে নজরে এসেছে। সকালে রাস্তায় বের হওয়া মানেই চোখে পানি আসা, গলায় চুলকানি, শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথা। ধূলি, ধোঁয়া এবং যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলযাত্রা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। দূষিত বাতাস শুধু ফুসফুসকে নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করছে। দীর্ঘ সময় এ বাতাসে থাকা মানে শারীরিক ও মানসিক দুটোই ক্ষতির মুখে পড়া।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় পাঁচ-সাত গুণ বেশি। বিশেষ করে PM2.5 ও PM10 কণা শহরের বাতাসে বিপজ্জনকভাবে উপস্থিত। প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ অকাল মৃত্যু ও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। গবেষণা দেখায়, ২০১৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকার যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এদের প্রায় ৬০ শতাংশ হলো পুরোনো ডিজেলভিত্তিক গাড়ি ও বাইক। শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া, বর্জ্য দাহ এবং নগরায়ণের চাপও বাতাসকে আরও দূষিত করছে।

ঢাকায় বায়ুদূষণ বাড়ার মূল কারণগুলো হলো যানবাহনের ধোঁয়া। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি শহরে চলাচল করে। পুরোনো গাড়ি ও বাইক থেকে ছড়ানো ধোঁয়া বিশেষ করে ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা যানবাহনের কারণে বৃদ্ধি পায়। প্লাস্টিক, পেইন্ট, ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার শিল্পের ধোঁয়া শহরের বাতাসকে দূষিত করছে। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পকারখানার ধোঁয়া স্থানীয় জনগণের জন্য বিপজ্জনক। খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের শ্বাসনালিও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন পোড়ানো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। নগর পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ঢাকার পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা নেই। ফলে ধূলি ও ধোঁয়া ছড়ানো সহজ হচ্ছে। নাগরিকরা দূষণ কমানোর বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। পলিউশন নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণের অভাব লক্ষ করা যায়।

দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকা মানে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি। শিশুদের শ্বাসনালি ও ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বেশি। বৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য বিপদ আরও গুরুতর। শুধু শারীরিক নয়, দূষণ মানসিক চাপও বাড়ায়। ঘুমের সমস্যা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ও বেড়ে যায়।

ঢাকার মতো শহরগুলোতে বায়ুদূষণ একটি সাধারণ সমস্যা। দিল্লি, মুম্বাই, কায়রো এবং মেক্সিকো সিটি—সব জায়গার মানুষের জীবনমান দূষণের কারণে প্রভাবিত। তবে সাংহাই, টোকিও এবং সিঙ্গাপুর আধুনিক প্রযুক্তি ও সবুজায়নের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে। এটি দেখায়, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে দূষণ কমানো সম্ভব।

প্রতিকার ও করণীয় বিষয় হচ্ছে—ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবহন সংস্কার করতে হবে। পুরোনো গাড়ি বন্ধ, ইলেকট্রিক গাড়ি ও সাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি, সিটি বাস ও সাইকেল লেন সম্প্রসারণ। কারখানার ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। খোলা দাহ বন্ধ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদার্থ ব্যবহার, সচেতনতা বৃদ্ধি। বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি, পার্ক ও খোলা জায়গা রক্ষা, ভবনের ছাদে সবুজ ছাদ। আমরা ব্যক্তিগতভাবে মাস্ক ব্যবহার, দূষিত এলাকায় অপ্রয়োজনীয় অবস্থান এড়িয়ে চলা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম—এসব করতে পারি। শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নাগরিকদের সচেতন থাকা, দূষণ কমাতে সহযোগিতা করা এবং জীবনযাপনে সবুজ বিকল্প গ্রহণ করা জরুরি। স্কুল ও কলেজেও পরিবেশ শিক্ষা বাড়ানো দরকার।

ঢাকার বাতাসে দূষিত কণার মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে, যা আমাদের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের জন্য হুমকি। সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান নেওয়া সময়ের দাবি। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ব্যবহার, নাগরিক সচেতনতা এবং সবুজায়নের মাধ্যমে ঢাকা শহরের বাতাসকে নিরাপদ করা সম্ভব। আজ যদি আমরা উদ্যোগ নিই, আগামী প্রজন্ম নিঃশ্বাসের ঝুঁকিতে থাকবে। নিরাপদ বাতাস আমাদের মৌলিক অধিকার।

সাকিবুল হাছান, সংগঠক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে ইসরায়েল : ট্রাম্প

যশোরে আ.লীগ-যুবলীগের তিন নেতা গ্রেফতার

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

১০

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

১১

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১২

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১৩

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৪

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৫

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৬

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৭

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৮

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৯

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

২০
X