

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, জানাজা, তারেক রহমানের ধীরলয়ে এগিয়ে যাওয়াসহ কয়েক দিনের ঘটনাক্রম রাজনীতিকে আবার একটা মোহনায় এনে দিয়েছে। কিছুটা ম্যাজিকের মতো বাঁক বদলে দিয়েছে ভারতের সঙ্গে কূটনীতিরও। যে কারও মৃত্যু একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাও নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে। তাও আবার দলমতের ঊর্ধ্বে উত্তীর্ণ খালেদা জিয়া। দেশীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা ছুটে গেছেন তার জানাজায়। জানিয়েছেন সম্মান, সমবেদনা। ছুটে এসেছেন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ এ অঞ্চলের দেশের নেতারা। কবে কখন বাংলাদেশ, এমনকি বিশ্ব এমন বাতাবরণ দেখেছে নির্ণয় করা কঠিন। সেখানে মাত্রা যোগ করেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ। মায়ের জানাজার ঠিক আগে, তিনি মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। ৫৮ সেকেন্ডের তার সে বক্তব্যে কারও প্রতি ক্ষোভ নেই, রাগ নেই, প্রতিহিংসার লেশমাত্র নেই। ছিল শুধু মায়ের পারলৌকিক মুক্তি আর নাজাতের জন্য আপামর মানুষের কাছে দোয়ার দরখাস্ত। তা এক অন্য ধাতুতে গড়ার বার্তা স্পষ্ট। রাজনীতি-কূটনীতিসহ আরও নানান নীতির জন্য তা ফ্যাক্টর।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দক্ষিণ এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া বা সহমর্মিতা বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিকানা সম্পর্কে তারা একটা ধারণা নিয়ে এ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়ে থাকতে পারেন। বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আসার মধ্যে কিছু বার্তা তো অবশ্যই রয়েছে। এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর হবে কি না, এ আলাপও ঘুরছে। জয়শঙ্করের মূল্যায়নে খালেদা জিয়া দেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতেও একজন সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। দুই দেশের চলমান টানাপোড়েন সম্পর্ক দূর করতে জয়শঙ্করের আসা কতটা প্রভাব ফেলবে, সেজন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হবে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য রাখা শোকবইয়ে এই বার্তা লেখেন তিনি। খালেদা জিয়ার জানাজায় অবিস্মরণীয় জনসমাগমে শরিক হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রদূতরাও। শোক ও সম্মানের এই ক্ষণে অংশগ্রহণ করেন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগিয়েল, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের আলোচনায় ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল দ্বিপক্ষীয় ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের রূপরেখা উঠে আসে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে তারা বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। একই সঙ্গে প্রতিটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। বাংলাদেশের অভিভাবক খালেদা জিয়ার অন্তিম যাত্রার আবেগ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ববাসীকেও আলোড়িত করেছে। নিজের মা খালেদা জিয়াকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়েও বাংলাদেশের হাল ধরার প্রশ্নে অবিচল থেকে। দল বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক-দেশবাসী তন্ময় হয়ে ক্রমশ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ছে তারেক রহমানের এমন উত্তীর্ণ মানুষের আচরণ দেখে। খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা সফরের ফাঁকে জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সঙ্গে প্রকাশ্য সাক্ষাৎ রাজনৈতিক-কূটনৈতিক দুভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এমন একটা সময়ে যোগ হয় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের বেশ আগে হওয়া একটি গোপন বৈঠকের খবর। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি নতুন বার্তা ছড়িয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল। ফলে যে কোনো গোপন রাজনৈতিক যোগাযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে বৈঠকের তথ্য প্রকাশ একটি প্রতিরোধমূলক বার্তা দেয়। জামায়াত ঘরানার মতে, ড. শফিকুর রহমান বৈঠক গোপন না রেখে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা একটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রকাশ—যেখানে জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা দলীয় কৌশলের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। বিপরীত কথাও আছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে এমন কোনো দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা অন্যায় নয়। কিন্তু বৈঠক করার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেটা গোপন রাখা, ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপটে সেটা প্রকাশ করার কারণে বিতর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে, কূটনৈতিক সাক্ষাৎ সবসময় প্রকাশ্য হওয়া সম্ভব নয় এবং অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই নির্দিষ্ট আলোচনা গোপন রাখা হয়। ফলে এই পদক্ষেপ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে প্রশ্নও উঠছে। কথা ও মতের এসব কচলানির মাঝেই শোকবইয়ে সই করতে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকের বৈঠক রাজনীতির মাঠকে নিয়ে এসেছে আরেক বাতাবরণে।
জামায়াত আমির বলেছেন, ‘দেশে একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জাতীয় নির্বাচনের পর এবং সরকার গঠনের আগে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে পারি কি না, সে বিষয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের পর কিন্তু শপথ গ্রহণের আগে আমরা আবার একসঙ্গে বসব।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে আমরা যেমন রাজপথে একসঙ্গে কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও করতে পারি। আগামী পাঁচ বছরের জন্য জাতির জন্য ভালো কিছু করতে আমরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’
তারা নির্বাচনের আগে-পরে, সরকার গঠনের আগে আবারও বসবেন। পাঁচ বছর একসঙ্গে দেশের জন্য কিছু করবেন, এ বার্তাও দিয়েছেন। জামায়াতের আমিরের কথায় নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠন ও জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত মেলে। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ গঠনে বৃহত্তর ঐক্যের বার্তা দেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, বেগম জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজীবন ভূমিকা রেখেছেন। ইতিহাসে তিনি বিরল সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছেন, যা তার প্রাপ্য ছিল। জাতির জন্য অবদান রাখলে সবার জন্যই এমন সম্মান অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তার বিদেশে চিকিৎসার জন্য একাধিকবার আবেদন করা হলেও সময়মতো অনুমতি দেওয়া হয়নি। অনুমতি মিলতে মিলতে তার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। আগামীর রাজনীতি ও সরকার গঠন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দেশে একটি সুন্দর ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জাতীয় নির্বাচনের পর এবং সরকার গঠনের আগে সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারে কি না, সে বিষয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণের আগেই আবারও বৈঠকে বসার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। একইদিন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম জানালেন তারেক রহমানের সঙ্গে তাদের একটি ছোট বৈঠকের কথা। যেখানে তারেক রহমান তাদের বলেছেন—ছাত্রদল, শিবির, ডাকসুসহ ছাত্রদের মিলেমিশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে। জুলাই বিপ্লবের চেতনা সংরক্ষণসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম সাংবাদিকদের জানান, তারেক রহমান দেশের ছাত্রসমাজ ও তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির ঐক্য অটুট রাখার ওপর জোর দেন। তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সাদিক কায়েম বলেন, রাজনীতিতে মতভিন্নতা বা বিভাজন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু বাংলাদেশ এবং জুলাই বিপ্লবের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে এক থাকতে হবে।
তারেক রহমানের এমন পরামর্শে মুগ্ধতার কথাও জানালেন সাদিক কায়েম। এক দিন আগেও কারও ধারণা ছিল না, হঠাৎ চিত্র এভাবে বদলে যাবে। তৈরি হবে বাঁকবদলের এমন আরেকটি মোহনা। যেখানে কদিন ধরে সমানে চলছিল নানা বুলিং। বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল-শিবিরের পরস্পরের প্রতি নানা সমালোচনা ও নোংরা কথা। সেখানে এখন হঠাৎ আবহ বদল। তারেক রহমানও চেয়ারপারসন কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস শুরু করলেন। পরিমিত কথাবার্তা দিয়ে সবার মন জয় করে চলছেন। ভারত, আওয়ামী লীগ কিংবা হাসিনার ও তার দলের কারও বিরুদ্ধে কোনো বিষোদ্গার করছেন না। মনে করা হচ্ছে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করবে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। তখন তিনি কী করবেন? হয়তো তিনি তখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ হবেন না। তিনি তার মায়ের ওপর যে আচরণ হাসিনা করেছে, তার ভাইয়ের ওপর ঠিকমতো সামরিক গোরস্তানে দাফন করতে না দিয়ে যে জুলুম করেছে কিংবা তার নিজের নামে যে বিষোদ্গার হাসিনা করে গেছে, তার কোনো বদলা না নিয়ে উদারতার পরিচয় দেবেন।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মন্তব্য করুন