

জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়টিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, নিরাপদ ভোটগ্রহণ এবং নাগরিকদের নির্ভয়ে মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সরবরাহ ও ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এ প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নয়, গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র এবং পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে তুলনামূলক ছোট আগ্নেয়াস্ত্র নিয়মিত প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানার অস্তিত্ব, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। খুলনায় অস্ত্র তৈরির একটি কারখানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অবৈধ অস্ত্রের ঝুঁকি শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের অভ্যন্তরেও তা বিস্তার লাভ করেছে।
নির্বাচনের আগে ও পরে এসব অস্ত্র প্রদর্শন, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় অবৈধ অস্ত্র বড় ভূমিকা পালন করে। ফলে এবারের নির্বাচন ঘিরে যে অস্ত্রের প্রবাহ ও মজুতের চিত্র উঠে আসছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, সীমান্তে যত অস্ত্র ধরা পড়ে, তার কয়েকগুণ বেশি অস্ত্র দেশের ভেতরে ঢুকে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র প্রবেশের বিষয়টি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ভারী অস্ত্র মানেই বড় সংঘাতের সম্ভাবনা। এ বাস্তবতা আমাদের ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকটি গুরুতর দিক হলো, থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখনো এক হাজারের বেশি লুণ্ঠিত অস্ত্র বাইরে রয়ে গেছে। এগুলো যে কোনো সময় অপরাধী চক্র বা রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে। এ অবস্থায় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-এ অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, বাস্তব ফলাফল আরও জোরালো হওয়া জরুরি।
তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, অবৈধ অস্ত্রের সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ দিয়ে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামাজিক সহনশীলতার ঘাটতি। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার রাজনীতি যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন অবৈধ অস্ত্রের চাহিদাও পুরোপুরি কমবে না।
এ কারণে অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান বৃদ্ধি এবং অস্ত্র তৈরির কারখানা ধ্বংসের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সহিংসতা উসকে দেওয়া বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে সব পক্ষকে।
জাতীয় নির্বাচন যেন ভয়ের নয়, বরং উৎসবের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এটাই জনগণের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সরকার যদি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দৃঢ় ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে নির্বাচন যেমন নিরাপদ হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাও সহজ হবে।
মন্তব্য করুন