

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বিদেশ থেকে পাঠানো মহামূল্যবান রেমিট্যান্স। আমরা সম্মান জানিয়ে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বলে থাকি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। কেননা, তাদের পাঠানো অর্থ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশ যাওয়া থেকে শুরু করে দেশে আসা পর্যন্ত পদে পদে ভোগান্তি, প্রতারণা ও অবহেলার শিকার হওয়াও অতি পরিচিত ঘটনা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকরা সিন্ডিকেটের হাতে যে জিম্মি, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক খরচের বাইরে সাতগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, সে চিত্র উঠে এসেছে কালবেলার একটি প্রতিবেদনে। বুধবার ‘সিন্ডিকেটের কবজায় কুয়েতের ভিসা’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে একটি সিন্ডিকেট কুয়েতে কাজের ভিসাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, কুয়েতের ভিসা প্রসেসিং ফি যেখানে ৫ হাজার ৩০০, সেখানে অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এভাবে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার কর্মী কুয়েতে পাড়ি জমিয়েছেন কাজের ভিসা নিয়ে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুসারে, কুয়েত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ষষ্ঠ বৃহত্তম গন্তব্য এবং রেমিট্যান্সের পঞ্চম বৃহত্তম উৎস। অভিযোগ উঠেছে, মাত্র ১৪-১৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট করে দেশটির ভিসা প্রসেসিং করে আসছে। যদিও দেশে প্রায় ২ হাজার ৯০০ বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে।
তবে বিলম্বে হলেও এ সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। এরই মধ্যে প্রতিযোগিতা কমিশন সিন্ডিকেট গ্রুপটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তলব করা হয়েছে ‘সিন্ডিকেট প্রধান’কে। এ সিন্ডিকেট প্রধানের বিরুদ্ধে উড়োজাহাজের গ্রুপ টিকিট মজুত করে উচ্চমূল্যে বিক্রিরও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সিন্ডিকেট বিষয়ে তদন্তে অনুসন্ধান কমিটিও করেছে সরকারি সংস্থাটি। আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
এ কথা সবারই জানা, বিগত সরকারের সময়ে যে সীমাহীন দুর্নীতি ও বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে, তা থেকে বের হয়ে অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙ্গা করে তোলা অতটা সহজ ছিল না। বিশেষ করে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় কিছুটা হলেও স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটা ছিল অনেক বড়। সরকারের অর্থ বিভাগ সে চ্যালেঞ্জের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে যে পেরেছে, তাতে কিন্তু রেমিট্যান্স যোদ্ধাদেরই সবচেয়ে বড় অবদান। এ সময় তলানিতে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি। এসব সম্ভব হয়েছে বিদেশে কর্মরত দেশ থেকে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য। অথচ এসব নাগরিকের বিদেশে যাওয়ার গল্পগুলো অত্যন্ত করুণ ও হৃদয়বিদারক। তাদের অধিকাংশই পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করেন। কারও কারও সেই সম্পদটুকুও নেই যে বিক্রি করবেন। তারা তখন উচ্চহারের সুদে ঋণ করেন। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে তা ধীরে ধীরে পরিশোধ করেন। কেউ কেউ আবার দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেন। আর যারা বিদেশে যেতে পারেন, তাদের ভিসাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি, বিশেষ করে নির্ধারিত খরচের অনেক বেশি খরচ করতে হয়। এসবই সম্ভব হয় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে।
আমাদের প্রত্যাশা, সরকার কুয়েতের ভিসাপ্রাপ্তির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি শুধু কুয়েত নয়, বিভিন্ন দেশের ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশে যেসব সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, সব সিন্ডিকেট ভাঙতে তৎপর হবে।
মন্তব্য করুন