

এক ঘটনার ফাঁকে বা বাঁকে ঝড়গতিতে আরেক ঘটনা। একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। অমিলও নেই। জোট-ভোট, আসনের ভাগযোগ, ভাষণের বড়াই, সালাম-আদাবের সঙ্গে খোঁচা-খিঁচুনিও কম নয়। মাঝেমধ্যে সহিংসতা, খুন-খারাবিও। এসব ধারাপাতের মধ্যেই ভোটের গাড়ির ছুটে চলা। নির্বাচনের এ চলতি পথেই বাংলাদেশের পোস্টাল ভোটের ব্যালট বাহরাইনে বেনামে-বেহাতে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। ইসিতে নালিশ, পাল্টা নালিশ। থাকছে সালিশও। নতুন করে গণভোটের পুরান কথা। আবার জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশও। কিছুই থেমে থাকছে না। তর্ক-বিতর্ক-কুতর্কসহ নানা বাঁকে, নানা ঘটনার ঘনঘটার মাঝেই যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেড় ঘণ্টার সাক্ষাৎ।
লন্ডন থেকে ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার পর যমুনায় গিয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে তারেক রহমানের এটাই প্রথম সাক্ষাৎ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় যান তারেক রহমান। সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও। ড. ইউনূস ও তার কন্যা দিনা ইউনূসের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়। পরে একসঙ্গে ডিনার। গোটা আবহটাই অন্যরকম। বিএনপি চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তারেক রহমানের এটা প্রথম সাক্ষাৎ। লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে দুজনের সেই বৈঠকের পর উভয়পক্ষের প্রতিনিধি যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন। এবার এখনো সেইরকমের বিবৃতি বা বক্তব্য নেই। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তার কন্যা দিনা ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা এক ঘণ্টারও বেশি সময় অতিবাহিত করেন। বিএনপি থেকে সাংগঠনিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, এ সাক্ষাতে রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা নেই।
এর আগে গত বছর ১৩ জুন লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেড় ঘণ্টাব্যাপী একান্ত বৈঠকের সময় তারেক রহমান ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এরপর লন্ডনে ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন তিনি। বিমানবন্দরে নেমেই তিনি নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহায়তার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ফোনে ধন্যবাদ জানান। এরপর ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের দেখা হয়। নির্বাচন সামনে রেখে একটা দেশের টালমাটাল পরিস্থিতিতে, যেখানে নির্বাচনে কারসাজি, একটি দলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সেইরকম সময়ে তারেক রহমান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার পরিবারের ৯০ মিনিট সৌজন্য আলাপচারিতা ইন্টারেস্টিং। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ঘুরছে—দলীয় শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে না নিয়ে শুধু পরিবারের সদস্যদের নিয়েই কেন হলো এ সাক্ষাৎ? এতে কি শুধু সৌজন্যমূলক কথাবার্তাই হয়েছে? দেশের পরিস্থিতি, নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা হয়নি? বিএনপির রাজনীতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কি পরিবর্তন ঘটতে পারে? শুধু রাজনীতির বুঝনেওয়ালা নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও সেদিকে দৃষ্টি না থেকে পারে না।
দিনলিপিতে দেখা যায়, যমুনায় তারেক রহমানের অবস্থানকালে এর একটু পাশেই কাকরাইলের আরেকটা ভেন্যুতে চলছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের আসন সমঝোতার দফারফা। আর দিনটির মধ্যভাগে যমুনা ও কাকরাইলের মাঝামাঝি ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে হয়ে গেছে আরেকটি বড় কাজ, জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ অনুমোদন। উপদেষ্টা পরিষদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ অনুমোদনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত ফৌজদারি দায় থেকে আন্দোলনকারীদের অব্যাহতি দেওয়া হবে। ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা জানান, এ অধ্যাদেশের আওতায় জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংঘটিত রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। ওই সময়ের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে আগে কোনো মামলা হয়ে থাকলে সেগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেবে সরকার। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত অপরাধ—বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড, এ দায়মুক্তির আওতায় আসবে না। লোভ, প্রতিশোধ বা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ড হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ফৌজদারি দায় থেকে রেহাই পাবেন না। কোনো ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. আসিফ নজরুল। ভুক্তভোগীর পরিবার যদি মনে করে, কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তাহলে তারা মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন।
কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের সমমর্যাদায় গণ্য হবে বলেও জানানো হয়। কোনোটা বা একটার জন্য আরেকটা থেমে থাকছে না। একমুখী হচ্ছে না রাজনীতি। সেইসঙ্গে বাড়তি হিসেবে যোগ হয়েছে গণভোট নিয়ে পুরোনো কথামালা। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে রেফারেন্ডাম, যেখানে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আইনগতভাবে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রেফারেন্ডাম নতুন কোনো ধারণা নয়, ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকারপ্রধানরা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এবারের রেফারেন্ডামটি হতে যাচ্ছে চব্বিশের ৫ আগস্ট সংঘটিত অসমাপ্ত বিপ্লবোত্তর এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলায়তন, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির দুঃশাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে গভীর অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে এ রেফারেন্ডাম গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করে বসে কি না, এরই মধ্যে সে ভয় তাড়া করছে। মুখে সকাল-সন্ধ্যা নানা কথা আওড়ালেও গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যে বড় রকমের ফারাক। গণভোটের ব্যাপারে সরকার উতলা পর্যায়ের আন্তরিক। জামায়াতে ইসলামীও তাই। বিএনপিও বলছে, তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। কিন্তু গণভোটের চেয়ে আলুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং পেঁয়াজের সংরক্ষণাগার স্থাপন কৃষকদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমন কথাও বলে রাখা হয়েছে বিএনপি থেকে। অবশ্য তারেক রহমান তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এখন পরিপূর্ণ চেয়ারম্যান হওয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের বাড়তি ভলিউম।
সেই ক্ষেত্রে রেফারেন্ডাম সত্যিকারের স্বচ্ছতা, সমান প্রচারাধিকার, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংলাপের ভিত্তিতে হলে এটি জনগণের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি নজির স্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা—শুধু সাংবিধানিক বৈধতা নয়, গণতান্ত্রিক নৈতিকতাও। ১২ ফেব্রুয়ারির রেফারেন্ডাম তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি পরীক্ষা। ওই পরীক্ষা সামনে রেখেই ঘটল ইউনূস-তারেক পারিবারিক সৌজন্য সাক্ষাৎ। এখন সামনের সিকোয়েন্স ও ঘটনা দেখার অপেক্ষা। এরই মধ্যে দৃশ্যমান যে, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্পিরিট না পেরেছে ছাত্রনেতারা, না পেরেছে রাজনৈতিক নেতারা ধরতে। তার ওপর ভিন্নমত সহ্য করতে না পারা বাতিকে রূপ নিয়েছে। কারও মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। উচিতও। অথচ মতের অমিল হলেই একপক্ষকে ‘অপর’ বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে; তা নির্বাচনের পর ফলাফল মেনে না নেওয়ার দিকে এগোতে থাকলে কী দশা হতে পারে, তা চিন্তার বিষয়।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পেছনে অন্যতম বড় বাস্তবতা ছিল জনগণের ভোটাধিকার দীর্ঘদিন কার্যকরভাবে সীমিত হয়ে পড়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ফলে ভোট নিয়ে মানুষের আবেগ আরও তীব্র হয়েছে এবং ভোটসম্পর্কিত যে কোনো ঘটনা এখন সহজেই বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা কারও কারও মধ্যে ‘এবার আমাদের খাওয়ার পালা’ এমন ধারণা ও সিদ্ধান্ত চেপে বসাও ভয় তৈরি করেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা একটি কঠিন কাজ। তা সরকার পারবে না। দলও একা পারবে না। তাদের আন্তরিকতা কতটুকু—এ প্রশ্নও আছে। নির্বাচন ঠিকঠাকভাবে হতে দেবে কি না, হতে দিলেও ফল মেনে নেবে কি না, সে বার্তাও পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশি সমাজ ভোটের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ভোটের অধিকার এখানে মানুষ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত সম্মান হিসেবেও দেখে। তাই ভোটসংক্রান্ত সন্দেহ মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়ায়। এ সন্দেহপ্রবণতা কোনো ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি বহু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় মনস্তত্ত্ব। প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক উদ্যোগটির চলতি পথে যে অবস্থা এরই মধ্যে করা হয়েছে, তা এ মনস্তত্ত্বেরই প্রকাশ। এ নিয়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোকে আমাদের সংবেদনশীলভাবে বিচার করলে উদ্বেগমুক্ত থাকা যায় না।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মন্তব্য করুন