

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলের সময়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে অস্থির একটি দেশকে তিনি এমন এক কূটনৈতিক পথে পরিচালিত করেন, যা বাংলাদেশকে শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং একটি দায়িত্বশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করাতে সহায়তা করেছে। তার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল বাস্তববাদ, বহুমাত্রিক সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার; যেখানে আদর্শিক কঠোরতা নয়, বরং রাষ্ট্রের টিকে থাকা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নই ছিল মুখ্য বিবেচনা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সুসংহত করা এবং বৈদেশিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করা। জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত হলেও তার অবস্থান ছিল দুর্বল ও অনেকাংশে নির্ভরশীল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি সদ্য স্বাধীন দেশ যদি শুধু একটি নির্দিষ্ট বলয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। সে কারণেই তিনি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রাধান্য দেন। পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ—সবদিকের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল তিনি গ্রহণ করেন, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের পাশাপাশি এ অঞ্চলে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি স্থায়ী ভিত্তি গড়ে ওঠে। আজ রেমিট্যান্স যে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, তার সূচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মূলত এ সময়েই তৈরি হয়।
ওআইসিতে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশকে একটি নৈতিক ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ফিলিস্তিন প্রশ্নে সংহতি, মুসলিম বিশ্বের সংকটে সহমর্মিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি সচেতন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
জাতিসংঘ ছিল জিয়াউর রহমানের কাছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। তার সময়েই বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ আসে ১৯৭৮ সালে, যখন স্বাধীনতার মাত্র সাত বছরের মাথায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটে জাপানকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশকে হারিয়ে এ সাফল্য বাংলাদেশের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, জিয়াউর রহমানের সময়কালে বাংলাদেশ শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বহুপক্ষীয় কূটনীতিতেও কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নজিরও স্থাপন করে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তাদের আটককে ঘিরে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক রীতি ও জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব তোলে, তখন বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ অবলম্বন না করে ভোটদানে বিরত থাকে। এ অবস্থান ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী। এতে একদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকেও বাংলাদেশ বিরত থাকে। এ সিদ্ধান্ত জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সংযত ও পরিমিত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা। দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও অবিশ্বাসের আবহে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া এ অঞ্চলের দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি সার্কের ধারণা উত্থাপন করেন। যদিও তার জীবদ্দশায় সার্ক আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি, তবুও আঞ্চলিক সহযোগিতার যে বীজ তিনি রোপণ করেন, সেটিই পরবর্তীকালে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে ওঠে। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়াকে সংঘাতের অঞ্চল থেকে সহযোগিতার অঞ্চলে রূপান্তরের এক দূরদর্শী চিন্তা।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সংবেদনশীল ও জটিল। তিনি সংঘাতের পথ পরিহার করে বাস্তবতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল যথেষ্ট কৌশলী। তিনি বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা আদর্শিক জোটে আবদ্ধ করেননি। জোটনিরপেক্ষতার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, একটি ছোট ও উন্নয়নশীল দেশও আত্মমর্যাদা বজায় রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে। এতে বাংলাদেশ যেমন বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় বৈরিতাও এড়াতে পেরেছে।
সমালোচকরা অবশ্য তার শাসনামলের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় ছিল। তবুও এটাও সত্য, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হতে দেননি। বরং কূটনীতিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করেছেন।
সব মিলিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল সময়ের বাস্তবতা থেকে উৎসারিত এক সচেতন প্রয়াস। তিনি বাংলাদেশকে একটি স্পষ্ট আন্তর্জাতিক পরিচয় দিয়েছেন—এটি একটি মুসলিমপ্রধান, উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, কিন্তু একই সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম ও দায়িত্বশীল একটি সার্বভৌম দেশ। আজকের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহু ভিত্তি তার সময়েই স্থাপিত হয়েছে। আর তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসী পথচলার সূচনায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অবশ্যই অনস্বীকার্য।
লেখক: প্রকাশক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন