

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে প্রচার। অর্থাৎ প্রায় ২০ দিনের একটি সীমিত সময়ের মধ্যে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে হবে প্রার্থীদের। এ অল্প সময়ে জনসমর্থন আদায়ের প্রতিযোগিতা যেমন তীব্র হবে, তেমনি অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আচরণবিধি মানার গুরুত্বও বহুগুণ বাড়বে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছে, তা শুধু নিয়মের তালিকা নয়, এগুলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত।
এবারের নির্বাচন প্রচারণায় সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো পোস্টার নিষিদ্ধ করা। দেশে প্রথমবারের মতো এ নিষেধাজ্ঞা নির্বাচনকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব করার একটি বাস্তব পদক্ষেপ। বছরের পর বছর নির্বাচনে পোস্টার অপচয়, দেয়াল দখল, শহর-গ্রামজুড়ে নোংরামি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি পলিথিন ও রেকসিনজাতীয় উপকরণ নিষিদ্ধ করাও সময়োপযোগী। পরিবেশ সুরক্ষা ও নগর ব্যবস্থাপনার কথা বিবেচনায় নিলে এসব সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সিদ্ধান্ত যত ভালোই হোক, বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে প্রার্থীদের সচেতনতা ও প্রশাসনের কঠোরতার ওপর। নিয়মের ফাঁক দিয়ে কেউ যদি লুকিয়ে পোস্টার বা নিষিদ্ধ সামগ্রী ব্যবহার করে, তাহলে এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং অন্য প্রার্থীদের জন্য তৈরি হবে অসম প্রতিযোগিতা।
আচরণবিধিতে প্রচারসামগ্রীর আকার, রং, ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন সাদা-কালো হতে হবে। এ নির্দেশনা ব্যয় কমানো এবং প্রদর্শনীমূলক প্রতিযোগিতা সীমিত করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০টি এবং নির্দিষ্ট মাপের মধ্যে রাখার নির্দেশও একই উদ্দেশ্যে। প্রার্থী ছাড়া অন্য ব্যক্তির ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধিত দলের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহারের অনুমতির নিয়ম প্রার্থীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখার সহায়ক। প্রচারের মাপকাঠি হওয়া উচিত কাজ, নীতি ও পরিকল্পনা; ব্যক্তিপূজার প্রদর্শনী নয়।
তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা রাজনৈতিক শালীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার বিধানগুলোকে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, নারী-সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ। বাস্তবে নির্বাচনের সময় এসব অপপ্রচারই সমাজে বিভাজন বাড়ায় এবং সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে। নির্বাচন মানে মতের লড়াই, কিন্তু সেটা যেন ঘৃণার লড়াই না হয়। প্রার্থীদের মনে রাখতে হবে, প্রতিপক্ষকে হেয় করে ভোট বাড়ে না; বরং গণতন্ত্র দুর্বল হয়, সমাজে ভীতি বাড়ে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ছয় মাস কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা জরিমানা, দলের জন্য অর্থদণ্ড এবং প্রার্থিতা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। এ শাস্তির কথা শুধু কাগজে থাকলে চলবে না। বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ইসিকে নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থীদেরও আত্মসংযম দেখাতে হবে। কারণ, নির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়া।
প্রার্থীদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় নয়, নীতি, কর্মসূচি ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে প্রচারণা চালাবেন। আচরণবিধি মেনে চলবেন, শালীন ভাষা বজায় রাখবেন, গুজব-বিদ্বেষ-ভুয়া তথ্য থেকে দূরে থাকবেন। নিয়ম মানলে নির্বাচন হবে গ্রহণযোগ্য, জনগণের আস্থা বাড়বে এবং গণতন্ত্র আরও শক্ত হবে।
মন্তব্য করুন