

হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কাদ্দাসা সিররাহুল আজিজ) [১৮২৬-১৯০৬খ্রি.] আধ্যাত্মিক জগতে স্বমহিমায় দেদীপ্যমান এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। যার অধ্যাত্ম শরাফত ও কারামাতের কল্যাণে অনাবিল করুণা বর্ষণ হয়ে আসছে সারা বিশ্বে। ইহজাগতিক ও পারমার্থিক উৎকর্ষ সাধনে তারই প্রবর্তিত মাইজভাণ্ডারী তরিকার শুদ্ধতম উচ্চারণ ও যথার্থ প্রয়োগের কথা সর্বজন বিদিত। সুফিবাদ চর্চার উর্বর ভূমি মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার জন্য অধ্যাত্ম মিলন কেন্দ্ররূপে শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে অভিষিক্ত হয়ে এসেছে। আল্লাহর দ্বীন প্রচার, প্রসার ও বিস্তারে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ভূমিকা অপরিসীম। তার ধর্মীয় অনুরাগ, ধর্মপ্রচারে আগ্রহ, আদর্শ, চরিত্র ও মানব হিতৈষণামূলক কার্যাবলির দ্বারা তিনি জনমানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন এবং অনায়াসে ইসলামের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করতে সমর্থ হন। শান্তি ও কল্যাণ পথের দিশারি এ মহান গাউছুল আজমের আদর্শ কৃতজ্ঞচিত্তে মানুষ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার নিগড়ে বেঁধে রেখেছেন হৃদয়ের গভীরে।
আত্মশুদ্ধির ও প্রশান্তির জন্য জিকির, তেলাওয়াতে অজুদ ও আত্মশুদ্ধির মৌলসূত্র উছুলে ছাবয়া বা সপ্তকর্ম পদ্ধতি প্রণয়ন করে মানুষের সহজাত কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে সাধন-ভজনের উপযোগী স্বভাব গঠনের পথ ও পন্থাকে তিনি সহজ করে দিয়েছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে প্রমাণিত এ মৌলিক সাধন-প্রণালি যুগপৎ বস্তুগত ও ভাব সাধনার নির্যাসকে ধারণ করে জাগতিক ও পারলৌকিক জীবনের নিহিতার্থকে গ্রহণ করতে তার পবিত্র হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন অগণিত মানুষ। আল্লাহর ভীতি ও শেষ বিচারের দিনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সংযম, নিত্যজীবনে দারুণ কৃচ্ছ্র ও ইবাদত-বন্দেগি ভরপুর জীবনাচারই মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রতিচ্ছবি হলেও এ তরিকায় প্রেমের মধ্য দিয়ে প্রিয়তম আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ভিত্তিরূপে পরিগণিত হয়। এভাবে মাইজভাণ্ডারী তরিকার মাধ্যমে যেন মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতের নেয়ামত অর্জন করতে পারেন এবং গাউছিয়ত কুতুবিয়তের মহিমা সমৃদ্ধ শরাফতের ঝর্ণাধারা বহাল রাখার লক্ষ্যে হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ওফাতের পূর্বে নিজ আদরের নাতি হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (কাদ্দাসা সিররাহুল আজিজ) [১৮৯৩-১৯৮২]কে খিলাফত প্রদান করে নিজ গদি শরিফে বসানোর মাধ্যমে সাজ্জাদানশীন মনোনীত করে যান। যিনি গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ও মাইজভাণ্ডারী তরিকায় স্বরূপ উন্মোচন, বিশ্লেষণ এবং পূর্বাপর সামগ্রিক বিশেষত্ব তুলে ধরে ছোট-বড় দশটি গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ করে মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রকৃত চিত্র সর্বজনের কাছে তুলে ধরেন। তিনি মাইজভাণ্ডারী সালতানাতে বসে পারিবারিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে স্বীয় আত্মার উন্নতির সাধন এবং মুরিদ আশেক-ভক্তগণকে আধ্যাত্মিক বিকাশের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন অব্যাহত গতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এই ঐতিহাসিক ধারাকে জারি রাখার লক্ষ্যে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার খেলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তিত্ব স্বীয় তৃতীয় পুত্র আলহাজ হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)[জন্ম ১৯৩৬]কে খেলাফত প্রদান করেন।
হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী গাউছিয়তের তাজধারী গদিনশীন ও স্থলাভিষিক্ত মনোনীত হওয়ার পর বাইয়াত প্রদান, শিক্ষা-দীক্ষা, শজরাদান, ফতুহাত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বসহ দ্বীন ও মিল্লাত, শরিয়ত ও তরিকতের গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মুর্শিদে বরহক হিসেবে তিনি নিজেকে শুধু আত্মোৎকর্ষতা লাভের জন্যই নিয়োজিত করেননি, তিনি ইসলামের জন্য এবং মানব হিতৈষণামূলক কাজেও নিজেকে উৎসর্গিত করেন। মানবসেবাকেই তিনি সৃষ্টির প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও প্রেমরূপে বিবেচনা করে থাকেন।
ধর্ম প্রচার, গাউছিয়তের বেলায়তি ধারা, বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার এবং মানবকল্যাণকর কার্যাবলির এই সমুদয় আদর্শ নিয়েই মানুষকে তাজকিয়া অর্জনে মানবিক বোধকে ধারণ করে জনকল্যাণমূলক মানবসেবার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম (মাদ্রাসা, মক্তব), পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্বাস্থ্য ও টেলিমেডিসিন সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সেবা, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন ও প্রকাশনা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তার লক্ষ্যে স্বনির্ভরতা উদ্যোগ, শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে বিশেষ কারিগরি শিক্ষার (আউটসোর্সিং) মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও আত্মনির্ভরশীল করতে কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন এবং করোনা মহামারিতেও বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক ই-কনফারেন্স ও অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি এবং অসংখ্য খানকা ও দায়রা শরিফ প্রতিষ্ঠা করেন। শরিয়ত, তরিকত, মানবতার কল্যাণে খানকা ও দায়রাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ-বিদেশের অসংখ্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত সামাজিক, ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও খানকাগুলো আধ্যাত্মিক, মানবকল্যাণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যাবলির কেন্দ্রে পরিণত হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর তার মুর্শিদের নামে ‘সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী স্বর্ণপদক ২০২১’ প্রবর্তন করেন। সুফিবাদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ স্বর্ণপদক সম্মাননা প্রদান করে সুধীমহলে প্রশংসিত হয়েছেন।
এই শরাফতের ধারা জারি আর সারি রাখার নিমিত্তে তিনি তার একমাত্র পুত্র শাহজাদা সৈয়দ আহমদ হোসাইন মুহাম্মদ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)[জন্ম ১৯৭২]কে ১৩ অক্টোবর ২০১১ সালে খেলাফত প্রদান করে একমাত্র পরবর্তী সাজ্জাদানশীন (বর্তমানে নায়েবে সাজ্জাদানশীন) মনোনীত করেন। যার পূত-পবিত্র চরিত্র, জীবনধারা ও অমায়িক আচরণ আপামর জনসাধারণ ও ভক্ত-আশেকগণকে এক সর্বজনীন আদর্শের দিকে আকৃষ্ট করে চলছে। তার প্রচেষ্টায় ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, শান্তি, সহমর্মিতা ও একাত্মতার নীতির প্রচার ও মাইজভাণ্ডারী তরিকার দর্শনের প্রসারে প্রভাবিত জনগণ অধিক সংখ্যায় আনন্দচিত্তে মাইজভাণ্ডারী তরিকা গ্রহণ করছে আর মন-মানসে মাইজভাণ্ডার দরবার এক স্থায়ী আসন লাভ করছে। ফলে মাইজভাণ্ডারী দর্শন অসংখ্য মানুষের কাছে নিত্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ্ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহর (কাদ্দাসা সিররাহুল আজিজ) গাউছিয়ত, কুতুবিয়তের মহিমা সমৃদ্ধ শরাফতের এ ধারা শজরার ধারাবাহিকতায় মনোনীত মহান সাজ্জাদানশীনের মাধ্যমে বর্তমানে যেমনিভাবে চালু রয়েছে, তেমনিভাবে কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ফয়ুজাত ও বরকাত নসিব করুন। আমিন।
লেখক: ফকিহ, নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম
গবেষক, দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট
(প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব)
মন্তব্য করুন