

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার একটি ঘটনাকে ‘অসাধারণ সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর গাজার একটি ফিলিস্তিনি কবরস্থান থেকে রান গিভিলি নামের এক ইসরায়েলি নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার করেছে। রান গিভিলি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নিহত হন। এ অভিযানের দৃশ্য ইসরায়েলি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। টেলিভিশনে দেখা যায়, ইসরায়েলি সৈন্যরা কবরস্থানের ভেতরে দাঁড়িয়ে একটি হিব্রু গান গাইছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এ অভিযানের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করে। পাশাপাশি তারা একে ‘জাতীয়ভাবে ক্ষত সারানোর একটি মুহূর্ত’ বা ‘জাতীয় নিরাময়ের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের অভিযান ইসরায়েলি সমাজের জন্য আবেগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গাজার মানুষের কাছে এই একই ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। এখানে, মরদেহ উদ্ধারের এই ইসরায়েলি অভিযান ভয়, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসে। কবরস্থানের আশপাশে ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। পাশাপাশি, শত শত ফিলিস্তিনি কবর ভেঙে ফেলা হয় বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মৃতদের প্রতি চরম অসম্মান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর ফলে শত শত ফিলিস্তিনি পরিবার এখন চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছে। অনেক পরিবারকে প্রিয়জনদের দেহাবশেষ খুঁজে বের করতে হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়া হাড়গোড় ও অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আবার চারটি পরিবারকে নতুন করে কবর খুঁড়ে তাদের স্বজনদের দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনা গাজার মানুষের জন্য শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং গভীর মানবিক কষ্ট, অপমান এবং শোকের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে ঘটনাকে বিশ্বের কাছে একটি ‘সাধারণ সামরিক অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি গুরুতর অপরাধ। কবর ধ্বংস বা কবরের অবমাননা জেনেভা কনভেনশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। এ কনভেনশন অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ এবং তাদের কবর অবশ্যই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। যুদ্ধ বা সংঘাতের মধ্যেও মৃতদের প্রতি এ সম্মান বজায় রাখা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি মৌলিক নীতি।
ফিলিস্তিনি প্রেক্ষাপটে কবরস্থানগুলোর ওপর এ ধরনের হামলা আরেক ধরনের সামষ্টিক শাস্তি বা কালেকটিভ পানিশমেন্ট হিসেবে দেখা হয়। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা হলো— ফিলিস্তিনি জনগণকে মৃত্যুর পরও কোনো মর্যাদা দেওয়া হবে না। জীবিত অবস্থায় যেমন তারা নিপীড়ন, অবরোধ ও সহিংসতার শিকার, তেমনি মৃত্যুর পরও তাদের সম্মান রক্ষা করা হচ্ছে না।
ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনি মৃতদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। চলমান যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই ইসরায়েল গাজা উপত্যকার বিভিন্ন কবরস্থানে হামলা চালিয়েছে। অনেক জায়গায় বুলডোজার দিয়ে কবরস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার কবর খুঁড়ে মৃতদেহ বের করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড ফিলিস্তিনি সমাজে গভীর ক্ষোভ, শোক ও মানসিক আঘাতের সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সিএনএন জানায়, গাজায় অন্তত ১৬টি ফিলিস্তিনি কবরস্থান ধ্বংস বা অপবিত্র করা হয়েছে। ইসরায়েল এসব কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে দাবি করে যে, হামাস কবরস্থানগুলোকে ‘সামরিক উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার করছিল। তবে স্যাটেলাইট চিত্র ও বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুরো কবরস্থান সমতল করে ফেলা হয়েছে এবং কিছু জায়গায় ইসরায়েলি সেনারা সেগুলোকে সামরিক অবস্থান বা ঘাঁটিতে রূপান্তর করেছে।
এ বাস্তবতা ফিলিস্তিনিদের কাছে শুধু অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা নয়, বরং তাদের ইতিহাস, স্মৃতি এবং মৃত স্বজনদের প্রতি সম্মানের ওপর সরাসরি আঘাত। কবরস্থান ধ্বংস মানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, পরিচয় এবং মানবিক মর্যাদা মুছে ফেলার আরেকটি প্রচেষ্টা।
ফিলিস্তিনি কবরস্থানগুলো শুধু ‘সামরিক প্রয়োজনের’ কারণে ধ্বংস করা হচ্ছে—এ যুক্তি বাস্তবে টেকে না। কারণ, এ ধরনের হামলা শুধু গাজায় সীমাবদ্ধ নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনি কবরস্থানগুলোতে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এ মাসের শুরুতে জেরুজালেমে একদল ইসরায়েলি বেসামরিক ব্যক্তি একটি মুসলিম কবরস্থানে হামলা চালিয়ে বহু কবর ভেঙে ফেলে ও ধ্বংস করে। এর আগেও, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জেরুজালেমে অবস্থিত একটি খ্রিষ্টান কবরস্থান অপবিত্র করা হয়েছিল, যেখানে বহু প্রখ্যাত ও জ্যেষ্ঠ খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতার সমাধি ছিল। এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, কবরস্থান ধ্বংসের বিষয়টি কোনো সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক নিপীড়নের অংশ।
ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ শুধু মৃতদের সমাধিস্থলেই সীমাবদ্ধ নয়; ফিলিস্তিনি মৃতদেহগুলোও সরাসরি এ সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত বছর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শত শত ফিলিস্তিনির মরদেহ গাজায় পাঠায়। এসব মরদেহের অনেকের শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। আবার অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছিল যে, তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে একাধিক গণকবরে এসব মরদেহ দাফন করে।
এ ছাড়া, বহু ক্ষেত্রে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছে। এটিও আরেক ধরনের সামষ্টিক শাস্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ইসরায়েলের কাছে এমন ফিলিস্তিনিদের মরদেহ রয়েছে, যারা ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় নিহত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও পরিবারগুলো এখনো তাদের প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানাতে পারেনি। ২০১৯ সালে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ‘আলোচনা বা দরকষাকষির উদ্দেশ্যে’ ফিলিস্তিনিদের মরদেহ আটকে রাখার অনুমতি দেয়, যা এ অমানবিক চর্চাকে আইনি বৈধতা দিয়েছে।
কবর অপবিত্রকরণ, কবর খুঁড়ে মরদেহ তুলে নেওয়া, মৃতদেহ বিকৃত করা, পরিবারগুলোর কাছ থেকে মরদেহ আটকে রাখা এবং এসব কর্মকাণ্ডের আইনি অনুমোদন এসবই একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ। এর লক্ষ্য হলো মৃতদের স্মৃতি মুছে ফেলা, তাদের প্রিয়জনদের শোক পালনের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং কোনো ধরনের মানসিক সমাপ্তি পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া। এটি শাস্তি দেওয়ার জন্য, এটি অপমান করার জন্য। এমনকি মৃত্যুর পরও ফিলিস্তিনিরা নিরাপত্তা ও শান্তি থেকে বঞ্চিত।
দুঃখজনকভাবে, ফিলিস্তিনি মৃতদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এসব অপরাধ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায় কোনো গুরুত্বই পায়নি। গাজা থেকে মুক্তি পাওয়া ইসরায়েলি বন্দিদের দাফন নিয়ে যেভাবে মানবিক গল্প, আবেগঘন প্রতিবেদন, বিস্তৃত ছবি ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার খবর প্রকাশিত হয়েছে, তার সামান্য অংশও ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। যেসব ফিলিস্তিনি পরিবারের প্রিয়জনদের কবর খুঁড়ে তছনছ করা হয়েছে, যাদের মৃতদেহ অপমানিত হয়েছে, তাদের গল্প বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়নি।
কোনো প্রতিবেদনে দেখা যায়নি সেই ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কথা, যারা কবরস্থানে গিয়ে তাদের স্বজনদের কবর ধ্বংস হয়ে থাকতে দেখে আতঙ্কিত ও ভেঙে পড়েছে। ছড়িয়ে থাকা কবরের অবশিষ্টাংশ আর ভাঙা সমাধি দেখে যে মানসিক যন্ত্রণা তারা অনুভব করেছে, তার জন্য কোনো বৈশ্বিক সহানুভূতি প্রকাশ পায়নি।
এতদিনে আমরা ইসরায়েলের হাতে সংঘটিত নানা ধরনের অকল্পনীয় অপরাধ প্রত্যক্ষ ও ভোগ করেছি। তবে এ অপরাধগুলোকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বিশ্বব্যাপী নীরবতা। এ নীরবতাই অপরাধকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং নিপীড়নকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে আজ আমাদের বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে—কবরস্থান পবিত্র স্থান, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সুরক্ষিত। আর এ সুরক্ষা শুধু কোনো একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর জন্য নয়; ফিলিস্তিনিদের কবরস্থানও এর অন্তর্ভুক্ত।
লেখক: ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক, আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ
মন্তব্য করুন