

বিচার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কিন্তু সেই ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সত্য উদঘাটনের পথে ফরেনসিক বিজ্ঞান আজ এক অবিচ্ছেদ্য সহযাত্রী। অপরাধ সংঘটনের মুহূর্তে যে সত্য উচ্চারিত হয় না, যে আলামত কথা বলে না, যে মৃতদেহ নীরব-ফরেনসিক বিজ্ঞান; সেখানেই নীরব সাক্ষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফরেনসিক বিজ্ঞান সাক্ষ্য দেয় যুক্তি দিয়ে, প্রমাণ দিয়ে, বিজ্ঞানের নিরপেক্ষ ভাষায়।
ফরেনসিক বিজ্ঞান বিচার ব্যবস্থায় একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এনেছে। যেখানে একসময় সাক্ষীর স্বীকারোক্তি বা পরিস্থিতিগত অনুমানের ওপর বিচার নির্ভর করত, সেখানে এখন ডিএনএ প্রোফাইল, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ব্যালিস্টিক মিল, ডিজিটাল ট্রেইল ও টক্সিকোলজিক্যাল ও মাদকের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ বিচারিক সিদ্ধান্তকে অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ করে তুলছে। ফলে এখন বিচার শুধু অনুমানের বিষয় নয়, বরং প্রমাণের বিজ্ঞান হয়ে উঠছে।
এ বিজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তিনটি ক্ষেত্রে—ক. অপরাধী শনাক্তকরণে: নির্দোষ ও দোষীর পার্থক্য নির্ণয়ে ফরেনসিক প্রমাণ বহু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে; খ. ভুল বিচার প্রতিরোধে: ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে ফরেনসিক পুনঃবিশ্লেষণ নির্দোষ ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়েছে ও গ. বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধিতে: বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ জনমনে আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। তবে এ কথা সঠিক যে, ফরেনসিক বিজ্ঞান নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এটি তখনই কার্যকর হয়, যখন তদন্তকারী সংস্থা দক্ষ, ল্যাবরেটরি মানসম্মত, রিপোর্ট সময়মতো প্রদানযোগ্য এবং বিচারকসহ আইনজীবীরা ফরেনসিক জ্ঞানে প্রশিক্ষিত হন। অন্যথায় এ নীরব সাক্ষীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায় যখন প্রমাণ সংগ্রহে ত্রুটি থাকে, চেইন অব কাস্টডিতে সমস্যা থাকে কিংবা, রিপোর্টে বিলম্ব বা ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উচ্চারিত রায়ের নাম নয়; ন্যায়বিচার শুরু হয় সত্য উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে। আর সেই সত্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ ও নীরব সাক্ষী হলো ফরেনসিক বিজ্ঞান। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ বিজ্ঞান আজও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা, জনবল সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতার ভারে ন্যুব্জ, যা উত্তরণ করা দরকার।
যে কোনো একটি হত্যাকাণ্ড হতে পারে ধর্ষণ, হতে পারে অগ্নিসংযোগ কিংবা সাইবার অপরাধ—সবক্ষেত্রেই ঘটনাস্থলের আলামতই বলে দেয় প্রকৃত কাহিনি। রক্তের দাগ, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ প্রোফাইল, আগুনের উৎস, ডিজিটাল লগ—এসবই সাক্ষ্যের ভাষা। উন্নত দেশে স্বীকারোক্তির চেয়ে আলামতের মূল্য বেশি। কারণ, মানুষ মিথ্যা বলতে পারে কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিথ্যা হয় না। তাই তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত ফরেনসিকে অপরিহার্যতা আকাশসম। বাংলাদেশেও ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায়। তবে এ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে এখনো সীমিত, ধীরগতির এবং কেন্দ্রনির্ভর। অনেক ক্ষেত্রে আলামত সংগ্রহের ভুল পদ্ধতি, দেরিতে পরীক্ষা বা রিপোর্ট জমা দিতে দীর্ঘসূত্রতা মামলার ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। দেশে ফরেনসিক ল্যাবের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জেলা পর্যায়ে মানসম্মত ফরেনসিক সুবিধা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ তদন্ত কর্মকর্তা ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ ও প্রেরণের আধুনিক প্রশিক্ষণ পায় না। ফলে মূল্যবান আলামত নষ্ট হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় contamination।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ মানবসম্পদ। ফরেনসিক রসায়ন, টক্সিকোলজি, ব্যালিস্টিক, ডিজিটাল ফরেনসিক—এ বিশেষায়িত ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী। অথচ এ পেশায় ক্যারিয়ার গঠনের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও প্রণোদনা নেই। ফলে মেধাবী ও দক্ষরা অন্য পেশায় চলে যায়। তাই ফরেনসিক বিজ্ঞানে বিভিন্ন কারণে দক্ষ মানবসম্পদ পাওয়া দুরূহ হয়ে যায়।
বিভিন্ন দেশে বহু আলোচিত মামলায় আলামতভিত্তিক তদন্ত দুর্বল হওয়ায় অপরাধী পার পেয়ে গেছে, আবার কোথাও নির্দোষ ব্যক্তি বছরের পর বছর কারাভোগ করেছে। আমি এ প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ দিচ্ছি—১. ডিএনএ বিশ্লেষণ ও ভুল সাজা সংশোধন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বহু মামলার ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে—চোখে দেখা সাক্ষীর বর্ণনা ভুল হতে পারে, কিন্তু জৈবিক আলামত নীরবে সত্য বলে দেয়। একাধিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কারাভোগ করা আসামি ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ‘Innocence Project’-এর মাধ্যমে ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৭০-এর বেশি মানুষ ডিএনএ প্রমাণে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তাদের অনেকেই ১০-৩০ বছর কারাভোগ করেছিলেন। এসব মামলার বেশিরভাগ ভুল চোখে দেখা সাক্ষ্য, জোর করে স্বীকারোক্তি বা ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত দায়ী ছিল; ২. ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন প্রাথমিকভাবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ মনে হলেও ফরেনসিক ময়নাতদন্তে বিষক্রিয়া বা শ্বাসরোধের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে এটা আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা নয়, বরং হত্যাকাণ্ড। ফলে নতুন দিকে মোড় নিয়েছে বিচার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্য হলো—ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বহু দেশে ভুল সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মুক্তি পেয়েছেন। ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় অনেক অপরাধ প্রমাণের অভাবে ঝুলে থাকে অথচ অপরাধীরা প্রযুক্তিতে দিন দিন আরও দক্ষ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় হতে পারে—প্রথমত, জাতীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি, যেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বাজেট নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন এবং জেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ইউনিট গড়ে তুলতে হবে; তৃতীয়ত, তদন্ত কর্মকর্তা, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের জন্য ফরেনসিক সাক্ষ্য মূল্যায়ন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান বাধ্যতামূলক করা দরকার; চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমম্বয়ে ফরেনসিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে; পঞ্চমত, ফরেনসিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপমুক্ত রেখে স্বাধীন ও পেশাদার কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
ফরেনসিক বিজ্ঞান বিচার ব্যবস্থার এমন এক নীরব সাক্ষী—যে মিথ্যা বলে না, পক্ষপাত করে না, ভয় পায় না। তবে তাকে কথা বলার সুযোগ দিতে হয়। একটি আধুনিক, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার ব্যবস্থার জন্য ফরেনসিক বিজ্ঞান কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি সময়ের অনিবার্য দাবি। কারণ, যেখানে মানুষ নীরব, সেখানেই বিজ্ঞান কথা বলে আর সেই কথার নামই ফরেনসিক বিজ্ঞান। ফরেনসিক বিজ্ঞান কোনো বিলাসিতা নয়; এটি ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত। একটি রাষ্ট্র যত বেশি বিজ্ঞানভিত্তিক হয়, তার বিচার ব্যবস্থা তত বেশি মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। রাষ্ট্র যদি তাকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, স্বাধীনতা ও মর্যাদা দেয়, বিচার ব্যবস্থা যদি তাকে যথাযথভাবে বোঝে ও গ্রহণ করে, তবে এ নীরব সাক্ষীই হয়ে উঠতে পারে ন্যায়বিচারের রক্ষায় সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে, ফরেনসিক বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আজ এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নয়, অবহেলা করা হলে ন্যায়বিচারের মূল্য হতে পারে চড়া ও অনাকাঙ্ক্ষিত।
লেখক: অধ্যাপক, সাবেক প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ
মন্তব্য করুন