কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ জুন ২০২৩, ১১:২৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসায়িক স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে তৎপর চীন

ব্যবসায়িক স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে তৎপর চীন

গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বেইজিং সফর করেন। সেই সফরকালে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মাহমুদ আব্বাসই প্রথম আরব প্রেসিডেন্ট যিনি ২০২২-এর ডিসেম্বরে রিয়াদে চীন-আরব শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রথম সেই দেশটি (চীন) ভ্রমণ করেছিলেন। আর এর ফলে এটাই প্রতীয়মান যে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি স্থাপনসহ অন্যান্য ইস্যুতে চীন বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে আর যাই হোক না কেন, এ সফরের ফলে চীন ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সম্পর্কের বেশ কিছু উন্নতি হয়েছে। যেমন, উভয় দেশই কৌশলগত অংশীদারত্বে সম্মত হয়েছে। ফিলিস্তিন শির বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভসহ বেইজিংয়ের আরও বেশ কয়েকটি পরিকল্পনায় অংশ নেবে। সেসব পরিকল্পনাগুলো হচ্ছে—গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ।

এ পরিকল্পনাত্রয়ী সম্মিলিতভাবে পশ্চিমাদের কাছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি বিকল্প মডেল উপস্থাপন করার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। এ ছাড়া উভয়পক্ষ তাদের মধ্যকার বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে। তবে এসব কর্মকাণ্ড ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করার জন্য চীনের নতুন প্রস্তাব এবং তা সফল হতে পারে কি না, তা নিয়ে জনশ্রুতি বা গুজব উসকে দিচ্ছে।

তাই কঠোর বাস্তবতা হচ্ছে, বেইজিং সম্ভবত শান্তির মধ্যস্থতা করতে সক্ষম হবে না। তবে শুধু চেষ্টা করে তার নিজের জন্য একটি ভূরাজনৈতিক অর্জন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা দিনের শেষে তার সাফল্যের তালিকায় আরেকটি পালক যোগ করবে। চীনের এ পরিকল্পনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করা।

এ ছাড়া আছে জেরুজালেমের ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা। এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করাও চীনের উদ্দেশ্য। তবে এ ধরনের অনেক চেষ্টাই বিগত কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলে চলে আসছে। কিন্তু এতে বেইজিংয়ের লাভ বা ক্ষতি কী?

বেইজিংয়ের লক্ষ্য

ফিলিস্তিন ইস্যুতে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য থেকে আবির্ভূত। সেই উদ্দেশ্য মূলত এ অঞ্চলে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বেইজিংয়ের বৃহত্তর উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রথমত, চীন ফিলিস্তিন-ইসরায়েলি অঙ্গনে আঞ্চলিক শান্তি প্রসারিত করতে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে সাফল্যের ভিত্তি করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ রক্ষা করতে আগ্রহী। আর যদি সংঘাতের অবসান বা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা যায়, আখেরে তারই সুবিধা হবে।

দ্বিতীয়ত, চীন অর্থনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বনেতা বানানোর চেষ্টা করছে। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব সমাধানের দিকে চীনের মাধ্যমে কোনো অগ্রগতি হলে, সেটা তার বিশ্বনেতা হওয়ার যে ভাবমূর্তি, সেটিকে আরও মজবুত করবে। আবার এ উদ্যোগের মাধ্যমে চীন নিজেকে একজন বিশ্বমোড়ল ঘরানার কিছু বানানোর চেষ্টা করবে। আর এটা চীনের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য।

তৃতীয়ত, চীন জিনজিয়াং, হংকং, তাইওয়ান এবং ইউক্রেনের সমস্যাগুলোর বিষয়ে পশ্চিমা চাপকে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। দেশটি চেষ্টা করছে এসব ব্যাপারে সমান গুরুত্ব দিতে। আর বলা যায় যে, চীনা মধ্যস্থতা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত এবং সংগ্রামের স্থায়ী সমাপ্তি আনতে সফল হলেও হতে পারে।

তবে এতে সফল হলে চীন শুধু কূটনীতি এবং মধ্যস্থতার একটি বিজয়ী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে তার কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও সুরক্ষিত করতে পারে। তবে আসলেই কি এ পদ্ধতি কাজ করবে? মনে রাখা দরকার, ক্রমবর্ধমান উৎসাহ ও কূটনীতির দিকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রবণতা সত্ত্বেও, শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইসরায়েলের কট্টরপন্থি সরকার এ অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর দখলদারিত্ব এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আক্রমণাত্মক সামরিক ও প্রযুক্তি-কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছে। আর এটা চলছে অনেক আগে থেকেই। এর ফলে বৃহত্তর ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যগুলো মৌলিক রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। সুতরাং কোনো কূটনৈতিক উপায়ে বা বাণিজ্য প্রণোদনার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে এ উদ্দেশ্যগুলোর অপব্যবহার করা যাবে না।

এ দ্বন্দ্ব, অনেকটা সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের মতো। আবার কিছুটা সমান অবস্থানে অবস্থিত দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো দ্বন্দ্বও নয়। এ দ্বন্দ্ব মূলত দখলকৃত এবং দখলদারের মধ্যে। এখন ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমি আরও সংযুক্ত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে জন্যই অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি এরই মধ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান অনেকটাই সেকেলে বানিয়ে ফেলেছে।

ফিলিস্তিনের জন্য, চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের আরও কিছু সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। একাধিক আরব দেশের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের বিচ্ছিন্ন করে। এর প্রতিবাদে ২০১৭ সালে মার্কিন সরকারের সঙ্গে ফিলিস্তিনিরা সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। পাশাপাশি তারা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সমন্বয়ও কমিয়ে দিয়েছিল।

সিএনএনকে দেওয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনা তার অগ্রাধিকার নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আব্রাহাম চুক্তি এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি সবার আগে বিবেচিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের পক্ষে কথিত মার্কিন পক্ষপাতের বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখতে আলোচনায় চীনা নেতৃত্বকে স্বাগত জানায়।

যেহেতু ফিলিস্তিন অর্থনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল, ওয়াশিংটন এখানে সাহায্য কমিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ বাড়ায়। এ কারণে মাহমুদ আব্বাস এবং তার প্রশাসনের প্রয়োজন চীনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তা। তা সত্ত্বেও, এই মুহূর্তে ফিলিস্তিনে চীনা সাহায্য ও বিনিয়োগ নগণ্যই বলা যায়। আবার এদিকে, চীন-ইসরায়েল অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে চৈনিক প্রভাবের জন্যও খুব একটা সুখকর নয়।

বর্তমানে চীন ইসরায়েলের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এ বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯৯২ সালে ছিল ৫০ মিলিয়ন ডলার। পরে এ পরিমাণ ২০২১ সালে এসে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এ প্রবণতার গতিপথ অনেকটাই পরিবর্তন করে ফেলেছে।

এ কারণে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চীনে ইসরায়েলের রপ্তানি প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে এসে স্থির হয়ে গিয়েছিল। আবার ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চীন থেকে ইসরায়েলের আমদানিও ১০.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। মনে করা হচ্ছে যে, ইসরায়েলে চীনা বিনিয়োগের ফলে বাণিজ্যে এ ধীরগতি তৈরি হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। আর শান্তির জন্য দর কষাকষি করলেও বেইজিংয়ের বাণিজ্য ব্যবহার করার ক্ষমতা মনে হয় না তার আগের রূপ ফিরে পাবে।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলতে বর্তমান উগ্র ডানপন্থি ইসরায়েলি সরকার অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এ কারণে এসব কিছুর অর্থ হলো, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে শান্তি অর্জনে চীনা প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম। তবে বেইজিং সম্ভবত ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য মধ্যস্থতা চালিয়ে যেতে পারে। কারণ এর ফলে অন্য কিছু হোক বা না হোক, চীনের নিজের কিছু স্বার্থ অর্জন হবে।

লেখকদ্বয় : আহমদ আলি একজন স্যাংশন এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ। আহমদ আলকারুত একজন বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক। নিবন্ধটি আলজাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন তৌহিদা জান্নাত

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মালয়েশিয়ার ৬৮তম স্বাধীনতা উদযাপনে নানা আয়োজন

‘প্রধান উপদেষ্টা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বিরোধী শক্তি হয়ে গেছেন’

ট্রাম্পের রক্তচক্ষুকে পাত্তা না দিয়ে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়াচ্ছে ভারত

ট্রাক ও অটোরিকশা সংঘর্ষে নিহত ১

বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস ম্যাচে বৃষ্টির সম্ভাবনা কতটুকু

প্রশাসনের গাফিলতিতে মধ্যরাতে মেয়েদের হল বন্ধ থাকে : জিএস পদপ্রার্থী জেরিন 

চুরির ভোটে জিতেই কি মোদি প্রধানমন্ত্রী? জোরালো হচ্ছে অভিযোগ

আর্জেন্টিনা খেলবে র‌্যাঙ্কিংয়ের ১৫৭তম দলের বিপক্ষে, জেনে নিন সময়সূচি

দুই বাচ্চার মা বলায় দেবের ওপর চটলেন শুভশ্রী

আশুলিয়ায় ছিনতাই চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার

১০

সংবিধানের বই উঁচু করে অধ্যাপক কার্জন বললেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে

১১

সাবমেরিন ক্যাবলে ত্রুটি, ৪ দিন ধরে অন্ধকারে ১৭ ইউনিয়ন

১২

চাঁদাবাজির অভিযোগে ৬ জনের নামে মামলা বিএনপি নেতার

১৩

বিচার, সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চাই : রাশেদ প্রধান 

১৪

৮ বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস 

১৫

শ্যামনগর যুবদলের নতুন আহ্বায়ক শেখ নাজমুল হক

১৬

বাবাকে হত্যার তিন দিন আগেই কবর খোঁড়েন ছেলে

১৭

নির্বাচন না হলে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে : মির্জা ফখরুল

১৮

লোকালয়ে ঘুরছে বাঘ, বিজিবির সতর্কবার্তা

১৯

যে তিন নায়িকা নিয়ে কাজ করতে চান যিশু

২০
X