মহিন উদ্দিন রিপন, টঙ্গী (গাজীপুর)
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৫, ০২:৫০ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৫, ০৯:২৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

টঙ্গীতে অভিযানের পরও সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেট

অপরাধ
টঙ্গীতে অভিযানের পরও সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেট

গাজীপুরের টঙ্গীর ১৯টি বস্তিতে অবাধে চলছে মাদকের ব্যবসা। যৌথ বাহিনীর অভিযানে মাঝে মাঝে ছোটখাটো মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও আসল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সোর্স প্রশাসনের অভিযানের তথ্য আগেভাগেই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, ফলে অভিযান চালানো হলেও মাদক ব্যবসা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্থানীয়দের দাবি, অনেক মাদক ব্যবসায়ী নিয়মিত থানায় এবং ডিবিতে মাসিক টাকা (মান্থলি) দেয়, ফলে দৃশ্যমান অভিযান হলেও মূল গডফাদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

সরেজমিন দেখা গেছে, টঙ্গীর প্রতিটি বস্তি এখন মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মাদকের হাট হিসেবে পরিচিত বস্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে গোহাটা বস্তি, হাজী মাজার বস্তি, হোসেন মার্কেট, কফিল উদ্দিন রোড, এরশাদনগর বাস্তুহারা বস্তি, ৩ নম্বর ব্লকের বস্তি, নতুন বাজারের ব্যাংকের মাঠ বস্তি, আমতলী কেরানীরটেক বস্তি, রেলওয়ে বস্তি, মাছিমপুরের জিন্নাতের পেছনের বস্তি, নিশাতনগরের পেছনের বস্তি, চুড়ি ফ্যাক্টরির বস্তি, তেতুলতলা বস্তি, সিপাই পাড়া, নামাবাজার, কলাবাগান, বেক্সিমকোর পেছনের বস্তি, টঙ্গী মেডিকেলের পেছনের বস্তি, কাঁঠালদিয়া বস্তি, আউচপাড়া, নোয়াগাঁও, নেকারবাড়ী, বেলতলা, সান্ডারপাড়া, সাতাইশ, গুটিয়া, খৈরতুলের ব্যাংকপাড়া বস্তি। এসব বস্তিতে রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও মাদকের ভয়ংকর নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

টঙ্গীর মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। স্থানীয়রা জানান, অনেক নারী বিপুল সম্পদের মালিক হলেও সতর্কতার কারণে বস্তিতেই বসবাস করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সাধারণত অপরিচিত কারও কাছে মাদক বিক্রি করে না, ফলে প্রশাসনের অভিযান চালিয়েও মূল গডফাদারদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকায় টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানা এলাকা মাদকের ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। গত ১ মার্চ সন্ধ্যায় যৌথ বাহিনীর প্রায় ২৬০ সদস্য হাজী মাজার বস্তিতে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ ও আর্মড পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন। এতে ৬০ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীও রয়েছে। উদ্ধার করা হয় ৩৯ হাজার ৪০০ টাকা, দেশীয় অস্ত্র, মোবাইল ফোন ও চার লিটার দেশি মদ।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা অত্যাধুনিক মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করছে। ফলে শুধু বস্তি নয়, মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে টঙ্গীর অভিজাত এলাকাগুলোতেও। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও মাদক ব্যবসা বন্ধ হয় না, কারণ ব্যবসায়ীরা জামিনে বেরিয়ে এসে আগের মতোই ব্যবসা চালিয়ে যায়। কিছু চিহ্নিত মাদক কারবারির নাম প্রকাশ করে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীরটেক বস্তির কাদিরের মেয়ে রুনা, তার স্বামী সুমন মিয়া, ছেলে রিফাত, নারগিস ও তার স্বামী কামাল গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সমবায় ব্যাংক মাঠ বস্তিতে মাদক সম্রাজ্ঞী মোমেলা ও তার স্বামী জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ফেনসিডিল ও ইয়াবা বিক্রি হয়। ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের এরশাদনগর ৩ নম্বর ব্লকে খালেদা, লিপি ও সোর্স আরিফের নেতৃত্বে মাদক ব্যবসা চলে।

কেরানীরটেক বস্তির এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদকের কারবার এতটাই বেড়ে গেছে যে, আমরা সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকি। প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার। এরশাদনগরের এক ব্যবসায়ী বলেন, সন্ত্রাসী বাহিনীর দাপটে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

অভিযোগ রয়েছে, যৌথ বাহিনীর অভিযানে বন্ধ হয়ে যাওয়া চার তারকা মানের আবাসিক হোটেল ‘জেভান’ আবারও চালু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হোটেলে কিশোর-তরুণদের কাছে বিদেশি মদ বিক্রি করা হয় এবং অসামাজিক কার্যক্রম চলে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার নাসির উদ্দিন বলেন, যৌথ বাহিনীর পাশাপাশি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশও মাদক কারবার বন্ধের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করি, খুব দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে লাভ নেই, মাদকের মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও মাদক ব্যবসা পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাকিস্তানে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ, নিহত ২৭

শিবগঞ্জ ও মোকামতলায় দিনব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ যুবদল কর্মীর মৃত্যু, আহত আরও ৩

আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন সাতক্ষীরার এমপি খালেক

ভুলের জন্য নাহিদ ইসলামদের উচিত দুঃখপ্রকাশ করা: রাশেদ খাঁন

রাজধানীতে যুবদল নেতাসহ গুলিবিদ্ধ ২

সাহাবুদ্দিনসহ যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ করতে পারেননি

শনিবার টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

কয়েল জ্বালাতে গিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দগ্ধ শ্রমিক দম্পতি

পেয়ারা পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

১০

ঝাঁকড়া চুলের হৃদয়বিদারক গল্প শোনালেন স্পেনের ডিফেন্ডার

১১

এমপির ইমামতি নিয়ে মসজিদে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের হাতাহাতি

১২

মেসির অবসর ও বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে এবার মুখ খুললেন ডি মারিয়া

১৩

‘জালালাবাদ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন জবির কাওছার

১৪

নতুন কোচের নাম ঘোষণা করল বেলজিয়াম

১৫

১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষা ফের দেওয়ার সুযোগ, অংশ নিতে পারবেন যারা

১৬

ফ্যাসিস্টের দোসর চুপ্পুকে গ্রেপ্তার করতে হবে: নাহিদ ইসলাম

১৭

ইরানের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিষেধাজ্ঞা

১৮

বিশ্বকাপের যে ব্যতিক্রম তালিকায় সবার উপরে এমবাপ্পে

১৯

রাশিয়া-চীনকে ইরানে অস্ত্র সরবরাহ না করার হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প

২০
X