বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৩৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যের শিকার ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপ
বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যের শিকার ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৪১.৯ শতাংশই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে নানাভাবে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। তাদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৪৯ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪০ শতাংশ। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং প্রায় ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। এ ছাড়া ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে রয়েছেন।

গতকাল শনিবার সকালে আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ‘বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক জরিপের ফল প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনে সংযুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সোহেল মামুন, আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ প্রমুখ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈষম্য হলো এমন একটি অবস্থা বা আচরণ, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অন্যদের তুলনায় কম মূল্যায়ন বা অবহেলা করা হয় এবং তাদের প্রাপ্য সমান সুযোগ, অধিকার বা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এটি নানা কারণে হতে পারে, যেমন—লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি। পড়াশোনাকালীন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। এর তীব্রতা বেড়ে গেলে একসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতা তৈরি হয়, এমন কি আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।

জরিপে ১১৭৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ৫৬.৬ শতাংশ, পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৩.১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ০.৩ শতাংশ। এর মেধ্য ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৬.৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ছিলেন ২৩ থেকে ২৬ বছর বয়সের শিক্ষার্থী, যা ৫৮.১ শতাংশ। ২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪.৩ শতাংশ এবং ৩০ বছরের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন ০.৯ শতাংশ।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৯.৬ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের, ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৩.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের এবং ১.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পলিটেকনিকের ছিলেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, ক্যাম্পাস জীবনে তারা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ পরীক্ষায় যে ফল পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, তারা সেটা পাননি এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ, অনুরাগ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ১৯ শতাংশ, শারীরিক অক্ষমতায় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ৭ শতাংশ, জাতিগত পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৯ শতাংশ, অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে শ্রেণিকক্ষে ৬০ শতাংশ, ১৯ শতাংশ হল বা ডরমিটরিতে এবং ৩৭ শতাংশ বিভিন্ন ইভেন্টে। বন্ধুদের আড্ডায় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৩৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮.০৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০.৬৫ শতাংশ।

শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি প্রায় ৫৮ শতাংশ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন সহপাঠীদের দ্বারা। এ ধরনের আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে এবং প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে দায়ী করেন।

বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিষণ্নতার লক্ষণ অনুভব করছেন, উদ্বিগ্নতা অনুভব করেছেন ৪৯ শতাংশ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩০ শতাংশের মধ্যে। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা বেড়েছে, স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করছেন ৪৭ শতাংশ। ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেছেন এবং ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা হীনম্মন্যতায় ভুগছেন।

মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ায় ক্লাস ও পড়াশোনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকমতো ক্লাসে যোগ দিতে ব্যর্থ হন এবং ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও প্রায়ই পড়াশোনায় মনোযোগ থাকে না।

জরিপের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে; ছয় মাস অন্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করতে হবে; বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ; প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বাক্স রাখা ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কমপ্লেইন সেল গঠন; শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ; উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনায় ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

‘আমি সেই ভাগ্যবান, যে বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারি’

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ

বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার অলির মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে ৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি

৩ মাসের জন্য এনসিপির ‘নির্বাহী কাউন্সিল’ গঠন

বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ৬৮তম

জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে : জাপা মহাসচিব

বার্নাব্যুতে নেমেই আরেকটি রেকর্ড নিজের করে নিলেন আর্জেন্টিনার ‘মাস্তান’

একাদশে ভর্তিতে যাদের আবেদন বাতিলের নির্দেশ

১০

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা 

১১

আসছে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স, দাম কত জানেন?

১২

নারী শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট ও দোয়া চাচ্ছেন ডাকসুর এজিএস পদপ্রার্থী মায়েদ

১৩

এয়ারলাইনসের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ / বিদেশ যেতে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন হোসাইন

১৪

প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, যে যোগ্যতা দরকার

১৫

মাঝআকাশে বোতল-ব্যাগে মলমূত্র ত্যাগ করলেন যাত্রীরা

১৬

ইরানের পাল্টা হামলা, ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন ৫৩ হাজার ইসরায়েলি

১৭

যোদ্ধাদের সামরিক প্রধানের পর মুখপাত্রের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ইসরায়েল

১৮

সবুজায়ন হচ্ছে রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি

১৯

বিইউবিটির আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে ৮ প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

২০
X