

ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর দুরবস্থার মূল কারণ হিসেবে সমন্বয়হীনতা ও সিটি মেয়রদের সীমিত ক্ষমতাকে দায়ী করেছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতারা। তাদের মতে, একটি শক্তিশালী নগর সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুললে নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান সম্ভব। তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নগর সরকার গঠন এবং নগর উন্নয়নে সুস্পষ্ট রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল সোমবার নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ ও গুলশান সোসাইটির যৌথ আয়োজনে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক নগর সংলাপে এসব বক্তব্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার সাদাত ওমর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা মূলত ময়লা পরিষ্কার ও বাতি লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় উচ্ছেদ অভিযানগুলো টেকসই করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বাবদ মাসে প্রায় ১৯ থেকে ২২ কোটি টাকা আদায় হলেও এর এক টাকাও সিটি করপোরেশন পায় না, সব অর্থ কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে চলে যায়। অথচ ট্রাফিক সিগন্যাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে সিটি করপোরেশনকে শত কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ওয়াসা, রাজউক ও পুলিশকে সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ গঠন না করলে শহরের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের জন্য আরবান সেফটি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম বলেন, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর কোনো সমন্বয় নেই। রাজনৈতিক স্বার্থে ঢাকা সিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যার ফলে নগর ব্যবস্থাপনা আরও দুর্বল হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ছাড়া মেয়রের পক্ষে অনেক কাজ করা সম্ভব নয়।
ঢাকা-১৭ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এস এম খালেদুজ্জামান বলেন, রাজনীতিবিদরা একা ঢাকার শহর গড়ে দেবে—এ ধারণা ভুল। শহর গড়ে ওঠে নগরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এমন প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে, যারা কথা রাখে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, তাদের ইশতেহারে ঢাকাকে বাঁচাতে ১০টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যার অন্যতম হলো সমন্বিত সরকার ব্যবস্থা। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসাসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করতে একটি সমন্বিত নগর সরকার কাঠামো প্রয়োজন। ঢাকার পরিধি নির্দিষ্ট করতে হবে এবং প্রতিটি এলাকায় সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারকে কাজ করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ওমর সাদাত বলেন, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া যাচ্ছে। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকাবাসীর গড় আয়ু কমছে সাত বছর সাত মাস এবং সারা দেশের গড় আয়ু কমছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. মুসলেহ উদ্দীন হাসান, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুর রব, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, স্থপতি রফিক আজম, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ মো. নুরুল্লাহ, গুলশান সোসাইটির সহসভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন প্রমুখ।
মন্তব্য করুন