

দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি ও মাছ-মাংসের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। বাজারে প্রতিদিনের কেনাকাটায় এ বাস্তবতা স্পষ্ট হলেও মজুরি কাঠামোতে তার প্রতিফলন নেই।
গতকাল রোববার পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, জানুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয় বা মজুরি। ডিসেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ যে হারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সে হারে মজুরি বা আয় বাড়েনি।
জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের বড় একটি অংশে এখনো আগের বছরের মজুরি কাঠামো বহাল আছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত বা নামমাত্র পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র শিল্প, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসার শ্রমিকদের আয় কার্যত স্থির। সরকারি চাকরিতেও সর্বশেষ বেতন কাঠামোর পর থেকে সময় গড়ালেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় ব্যবস্থা নেই। ফলে বাস্তব মজুরি কমছে, যদিও কাগজে-কলমে বেতন অপরিবর্তিত।
গ্রামাঞ্চলেও চিত্র ভিন্ন নয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, সেচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য অনেক সময় নিশ্চিত হচ্ছে না। দিনমজুর ও মৌসুমি শ্রমিকদের মজুরি কিছু ক্ষেত্রে সামান্য বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় নগণ্য। শহরমুখী শ্রমিকদের আয় স্থির থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সব ধরনের চালের দাম কিছুটা কমলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের প্রভাব এখনো বড়। ডিসেম্বর মাসে চালের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমেছে, যা নভেম্বরে ছিল ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ। মাঝারি, সরু ও মোটা—সব ধরনের চালের দামেই সামান্য শীতলতা দেখা গেছে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান নভেম্বরের ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমেছে। এর বিপরীতে মাছ ও শুঁটকি মাছের দাম বেড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। ডিসেম্বরে মাছ ও শুঁটকির অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশে।
সবজি খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে এখনো বড় ধরনের স্বস্তির কারণ উল্লেখ করে জিইডির প্রতিবেদন বলছে, ডিসেম্বর মাসে সবজির নেতিবাচক অবদান আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাইনাস ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদের হার ভোক্তা ঋণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। অনেক পরিবার আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন করে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও কমছে। এতে ভোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও ঝুঁকি।
এসডিজি স্থানীয়করণে ‘এসডিজি গ্রাম’ উদ্যোগ: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জিইডি। খুলনা, কুড়িগ্রাম ও রাঙামাটির তিনটি গ্রামে ‘এসডিজি গ্রাম পাইলটিং উদ্যোগ’ চালু করা হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় গ্রামভিত্তিক জরিপ, চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এসডিজি বাস্তবায়ন জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন