বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
জুনায়েদ শিশির
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০৩:০৬ এএম
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০৯:৫১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গবাদি পশুর খাদ্যাভ্যাসে ফিরছে ঘাসনির্ভরতা

বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ
গবাদি পশুর খাদ্যাভ্যাসে ফিরছে ঘাসনির্ভরতা

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফিডের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে গবাদি পশু পালনের ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। এতে একদিকে খামারিদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চেপে বসেছে, অন্যদিকে বাজারে দুধ ও মাংসের দামও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় পশুখাদ্য হিসেবে ঘাসের ওপর নির্ভরশীলতা ফেরাতে চাইছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পতিত ও অনাবাদি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ঘাস উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে উৎসাহিত করছে সংস্থাটি। এতে বিভিন্ন এলাকায় বেকার যুবকদের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল জাতের ঘাস চাষে আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমূল্যের দানাদার খাদ্যের পরিবর্তে সবুজ ঘাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে মাংস ও দুধের স্বাদ বাড়বে, অন্যদিকে এসব পণ্যের দামও কমে আসবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে ২০১৯ সাল থেকে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর আওতায় গো-খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৪৬৫টি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে উন্নত জাতের ঘাসের (নেপিয়ার, পাকচং, জাম্বু, পারা ইত্যাদি) নার্সারি বা প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। এসব নার্সারি থেকে উৎপাদিত কাটিং আগ্রহী কৃষক ও খামারিদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত উপজেলার খামারিদের এ ধরনের ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক ও প্রান্তিক খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারণভূমি বা বাইরে বেঁধে রাখার জায়গার অভাবে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গোয়ালে (শেড) রেখে গবাদি পশু পালন করা হয়। এক্ষেত্রে পশুদের খড় ও ঘাসের পাশাপাশি খৈল, গমের ভুসি, ধানের ভুসি বা রাইস পলিশ খাওয়ানো হয়। এ ছাড়া মোটাতাজা করতে বিভিন্ন কোম্পানির কৃত্রিম ফিডও (দানাদার খাদ্য) দেওয়া হয়। এসব খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় গবাদি পশুর উৎপাদন ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে যায়।

সুনামগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা শফিউল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাঁধ নির্মাণের জন্য কৃষিজমির মাটি তুলে নেওয়ায় গবাদি পশুর চারণভূমি কমছে। এতে খামারিরা বাধ্য হয়ে দানাদার খাবার দিয়ে পশুপালন করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশে দুধ ও মাংসের বাজারে অস্থিরতা কমবে না।’

এ বিষয়ে এলডিডিপির চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. মো. গোলাম রব্বানী কালবেলাকে বলেন, ‘গবাদি পশু পালনের ক্ষেত্রে সংখ্যার পরিবর্তে দুধ ও মাংসের উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে কম জায়গায় পর্যাপ্তসংখ্যক পশুপালন সম্ভব হবে। সংখ্যা কমলে খাদ্যব্যয়ও কমবে। পতিত বা পরিত্যক্ত জমিতে হাইব্রিড ঘাস চাষ করে পশুখাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এতে কৃত্রিম খাদ্যের পরিবর্তে প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন দুধ ও মাংস সরবরাহ সম্ভব হবে।’

জানা গেছে, এক সময় কৃষক মাঠে কাজের সময় ফসলের খেত নিড়ানিতে যে ঘাস বা আগাছা তুলতেন, সেগুলো পানিতে ধুয়ে গরুকে খেতে দিতেন। এর সঙ্গে সংরক্ষণে থাকা শুকনা খড় ও সরিষার খৈল দিয়ে বছর পার করতেন। এতে কৃষকের গবাদি পশু পালনে বাড়তি ব্যয় করতে হতো না। এখন আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যয় বাড়ছে খামারিদের। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা পশুপালনে দানাদার খাবারের পরিবর্তে চারণভূমির পাশাপাশি ঘাষ চাষে খামারিদের উৎসাহিত করছেন।

খামারিরা জানান, গত ৫ বছরে দেশে গবাদি পশু খাদ্যের দাম ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ বা তারও বেশি হারে বেড়েছে। শুধু গত তিন মাসেই প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। তিন মাস আগে ৩৭ কেজির এক বস্তা গমের ভুসির দাম ছিল ১৭০০ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৯০০ টাকায়। একইভাবে ২৫ কেজি ওজনের ছোলার খোসার বস্তা ১৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫০ টাকায়, ২৫ কেজির দানাদার ফিডের বস্তা ১২২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৭০ টাকায়, ৫০ কেজির চালের খুদের বস্তা ১৯০০ টাকায়, ৫০ কেজির ভুট্টার বস্তা এলাকাভেদে ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আসন্ন কোরবানিতে পশুর দাম বেড়ে যেতে পারে। যেসব খামারি দানাদার খাদ্যের পরিবর্তে পশুকে ঘাস খাওয়াচ্ছেন, এ বছর তারা বেশি লাভবান হবেন।

জানা গেছে, প্রতি কেজি সবুজ ঘাস বর্তমানে এলাকাভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ১২ টাকা করে। এ ছাড়া দানাদার খাবারের বিকল্প হিসেবে খামারিদের মধ্যে ভুট্টার সাইলেজের ব্যবহার বেড়েছে। প্রতি কেজি ভুট্টার সাইলেজ ১২-১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, ‘প্রচলিত শুকনা গো-খাদ্যে পুষ্টিগুণের বিভিন্ন প্রতিকূলতা রয়েছে। এ ছাড়া দানাদার খাদ্যের মাধ্যমে দুধ-মাংস উৎপাদন খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। এ অবস্থায় আমরা ধীরে ধীরে দানাদার খাদ্য থেকে সরে আসার চেষ্টা করছি। খামারিদের হাইব্রিড জাতের ঘাস উৎপাদনে উৎসাহ করছি। পাশাপাশি দানাদারের বিকল্প হিসেবে ভুট্টার সাইলেজ ব্যবহার শুরু করেছি। এতে ভালো ফল পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘খামারিদের পক্ষ থেকে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে অনুরোধ করা হয়েছে, এমন একটি জাত উদ্ভাবন করার জন্য, যে ধানটির খড় সবুজ থাকবে এবং ঘাসের মতো পুষ্টিগুণ ঠিক থাকবে।’

সাভার কৃত্রিম প্রজনন ল্যাবরেটরির সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার মো. শানে খোদা বলেন, ‘অনেক খামারি মনে করেন, বেশি দানাদার খাবার দিলে গাভি ভালো দুধ দেবে। বাচ্চা ভালো থাকবে; কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। এতে উল্টো গাভির গ্যাস সমস্যাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা বাড়তে পারে। ঘাস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান রুপাই সাইলেজের সেলস অ্যান্ড কাস্টমার অ্যাকুইজিশন ম্যানেজার জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে চারণভূমির পরিমাণ দিন দিন কমছে। গো-খাদ্যের দামও ক্রমাগত বাড়ছে। সেজন্য দেশে গড়ে উঠছে সাইলেজ প্রতিষ্ঠান। এতে কর্মসংস্থানের সঙ্গে ভুট্টার চাষ বাড়ছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩৪৯ জনকে আসামি করে মামলা, পুরুষশূন্য তিন গ্রাম

চশমা সাইদের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

তিন ঘণ্টা পর চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ শুরু

মানহানি মামলা করলেন এনসিপি নেত্রী

ময়মনসিংহে ট্রেনের তিন বগি লাইনচ্যুত

ইতালির ১৫টি শহরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি

জবি ছাত্রদলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে চিকিৎসক লাঞ্ছনার অভিযোগ

‘আ.লীগের জায়গা আছে, বিএনপি-জামায়াতের যাওয়ার জায়গা নেই’

ডা. জুবাইদা রহমানের ৫৫তম জন্মদিন উপলক্ষে ঢামেকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

ধানমন্ডিতে সাংবাদিককে মারধর : জামায়াতের চার কর্মী বহিষ্কার

১০

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত মৃদুল, দাবি পরিবারের

১১

বৃহস্পতিবার টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

১২

আজ গোল করলেই পেলের রেকর্ডে ভাগ বসাবেন নেইমার

১৩

শাহজালাল বিমানবন্দরে আনসারদের তৎপরতায় প্রবাসীর হারিয়ে যাওয়া লাগেজ উদ্ধার

১৪

খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় মোদিকে ইরানের আমন্ত্রণ

১৫

বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই তিস্তার পানি, প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল

১৬

বিএমইউর ৫৩৯ রেসিডেন্টকে থিসিস গ্র্যান্ট প্রদান

১৭

বিশ্বকাপ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে!

১৮

‘ফাইনাল পর্যন্ত’ আর্জেন্টিনার সূচি জানা গেল, শেষ বত্রিশে প্রতিপক্ষ কারা

১৯

আওয়ামী লীগ থেকে ইউপি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

২০
X