বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মিঠাপানির উৎস ব্রহ্মপুত্র নদ এখন চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই নদীর পানি হাজার বছর ধরে এ দেশের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদীর উজানে একের পর এক বিশাল বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন এক দুঃস্বপ্ন ডেকে আনছে।
উৎস ও ভৌগোলিক পথ
ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হিমালয়ের তিব্বতে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচু হিমবাহ থেকে। স্থানীয়রা একে বলে ইয়ারলুং সাংপো। উৎস থেকে এটি পূর্বদিকে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর আচমকা বাঁক নিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে। সেখানকার নাম হয় সিয়াং। পরে আসাম অতিক্রম করে এটি ‘ব্রহ্মপুত্র’ নামে পরিচিত হয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং দেশের জীবন-প্রবাহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে যায়।
চীনের মহাপরিকল্পনা
চীন বর্তমানে তিব্বতের উজানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণে এগোচ্ছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকবে, যা বিখ্যাত ইয়াংসি নদীর থ্রি গর্জেস ড্যামের ক্ষমতার প্রায় তিনগুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন চাইলে এই বাঁধের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি সরিয়ে নিতে পারবে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর ভাটির অংশে পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। কোটি মানুষের কৃষি, শিল্প, মৎস্যচাষ ও দৈনন্দিন জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। শুধু ভারত নয়, ভাটির দেশ বাংলাদেশও পড়বে ভয়াবহ ঝুঁকিতে।
ভারতের পাল্টা উদ্যোগ
চীনের পরিকল্পনার জবাবে ভারতও বসে নেই। দেশটি অরুণাচল প্রদেশে আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস স্টোরেজ ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কয়েক দশক ধরে স্থানীয় বিরোধিতার কারণে আটকে থাকা এই পরিকল্পনা এখন নতুন করে গতি পাচ্ছে। ভারতীয় সরকারের দাবি, এই বাঁধে প্রায় ১৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে।
শুষ্ক মৌসুমে পানি ছেড়ে নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং চীন যদি হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয় তবে ভয়াবহ বন্যা থেকে ভাটির অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করার জন্যই নাকি এই প্রকল্প।
কিন্তু অরুণাচলের আদি জনগোষ্ঠী এ পরিকল্পনার কড়া বিরোধিতা করছে। তাদের অভিযোগ, বাঁধ নির্মিত হলে প্রায় ১৬টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাবে এবং অন্তত এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। কৃষিজমি, ফলের বাগান, এমনকি প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রা হারিয়ে যাবে। স্থানীয়রা ঘোষণা দিয়েছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
চীনের অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, তাদের প্রকল্প নিয়ে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়েছে এবং এতে ভাটির দেশগুলোর পানি প্রবাহ, পরিবেশ বা ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতার ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। বেইজিং আরও বলছে, তারা অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারে সবসময় দায়িত্বশীল থেকেছে এবং ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রেখেছে। তবে তারা পানি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে-এমন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। একসঙ্গে দুটি বৃহৎ বাঁধ নির্মিত হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। বড় ধরনের ভূমিকম্প বা দুর্ঘটনায় বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ বন্যা চীন, ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে।
ফলে বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল পানিসংকটের প্রশ্ন নয় বরং একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা, অন্যদিকে বর্ষায় হঠাৎ বন্যা- দ্বিমুখী বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিশেষে
চীন ও ভারতের এই পাল্টাপাল্টি বাঁধ যুদ্ধ আসলে ভাটির দেশ বাংলাদেশকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে। কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও কোটি মানুষের জীবনযাত্রা এর ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং টেকসই সমাধান ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ প্রবাহ বাংলাদেশের জন্য এক গভীর অনিশ্চয়তা বয়ে আনছে।
মন্তব্য করুন