স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের মধ্যে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে দেশি অনুসন্ধান কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি যৌথভাবে কাজ করবে। এরই মধ্যে তিনটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এরপর তা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে হবে চুক্তি। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের পর এ চুক্তি হবে। কোম্পানিগুলো হলো রাশিয়ার গ্যাজপ্রম, চীনের সিনোপ্যাক ও উজবেকিস্তানের এরিয়েল।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব নূরুল আলম বলেন, স্থলভাগের কিছু কিছু জায়গায় আমরা গ্যাস পেয়েছি, সেখানেও বিদেশি কোম্পানি কাজ করেছে। দেশি-বিদেশি কোম্পানি যৌথভাবে কাজ করলে গ্যাস অনুসন্ধান কাজ দ্রুত হবে। এখন বিদেশ থেকে উচ্চদামের এলএনজি এনে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তাই দেশের গ্যাস অনুসন্ধান কাজ জোরদার ও সরবরাহ বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাজ করছে পেট্রোবাংলার অধীন তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। তবে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এ কাজে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের মধ্যে ৪৬ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। এসব কূপ খননের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ কূপে যৌথভাবে কাজ করবে বহুজাতিক তিন কোম্পানি। ভোলায় বাপেক্সের আওতাধীন পাঁচটি কূপে গ্যাজপ্রম খনন কার্যক্রম চালাবে, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফসিএল) আওতাধীন পাঁচটি কূপে সিনোপ্যাক আর বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) সাতটি কূপে এরিয়েল খনন কার্যক্রম চালাবে।
সরকার এসজিএফসিএলকে সিলেটের কূপ পাঁচটিতে খননের অনুমোদন দিয়েছে বিশেষ বিধানের আওতায়। এর মধ্যে চারটি অনুসন্ধান ও একটি উন্নয়ন কূপ। অনুসন্ধান কূপগুলো হলো রশীদপুর-১১ ও ১৩, কৈলাশটিলা-৯ এবং সিলেটের ডুপিটিলা-১ আর একমাত্র উন্নয়ন কূপ সিলেট-১১। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। ভোলায় কূপ খননে গ্যাজপ্রমের দেওয়া প্রস্তাবের কারিগরি ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো মূল্যায়ন শেষে এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগে প্রতিবেদন দিয়েছে বাপেক্স। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে গ্যাজপ্রমের সঙ্গে বিভাগের দরকষাকষি চলছে। জানা গেছে, এ পাঁচ কূপের মধ্যে অনুসন্ধান কূপ একটি, বাকিগুলো উন্নয়ন কূপ। এগুলো খননের জন্য রুশ কোম্পানিটি ১২০ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে।
বিজিএফসিএলের আওতাধীন সাত কূপ খনন ও সংস্কারে এরিয়েলের প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে জ্বালানি বিভাগ। এর চারটিতে খনন ও তিনটিতে ওয়ার্কওভার করবে তারা। এজন্য উজবেক কোম্পানিটির পক্ষ থেকে ব্যয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ১৩১ মিলিয়ন ডলার। তবে প্রস্তাব খতিয়ে দেখার পর এ ব্যয় কিছুটা কমবে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থলভাগে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে আরও আগেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দিয়ে কাজ করানো উচিত ছিল। এতে করে এখন যে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, সেটা হতো না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, গ্যাসের সংকট মোকাবিলা এবং স্থলভাগে উৎপাদন বাড়াতে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করানো উচিত। তবে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী জানান, যেসব স্থানে অনুসন্ধান চালানোর মতো কারিগরি সক্ষমতা বাপেক্সের নেই, সেসব এলাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এখন বিদেশি কোম্পানিগুলো ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ খনন, সংস্কার ও ওয়ার্কওভারের কাজ করাচ্ছে। বরং স্থলভাগে পিএসসি চুক্তি করে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অনুসন্ধান কাজ করাই ভালো।