রাজধানীর নতুনবাজারের ভাটারায় অমর জ্যোতি স্কুলের ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মেয়েদের ফ্রকে পুঁতি বসাচ্ছিল শান্তা ইসলাম। এ ছাড়া পুঁতি দিয়ে ব্রেসলেট, নূপুর ও ব্যাগ বানাতে পারে শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েটি। হাতের কাজ, প্যাকিং ও স্টিকার লাগানোর প্রশিক্ষণ চলছে তার। পাশাপাশি গুলশান মডেল স্কুল ও কলেজ থেকে চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে সে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় শান্তার। সে জানায়, ছোটবেলায় হাঁটতে পারত না। অল্প বয়সে বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। আর ৭ বছর বয়সে গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে লেবানন চলে যান মা। সে নানা-নানির কাছে বড় হয়েছে। চার বছর বয়সে তার বাঁ-পায়ের সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর চিকিৎসা শুরু হয়। কয়েক বছর নিয়মিত থেরাপি দেওয়ার পর একটু একটু করে হাঁটতে শেখে। পড়াশোনার পাশাপাশি এখন সে প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হাতের কাজ শিখছে।
একই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কাজ শেখে ১৪ বছর বয়সী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী সেতু। চতুর্থ শ্রেণি পার হওয়ার পর অভাবের কারণে আর পড়াশোনা হয়নি তার। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হাতের কাজে সে বেশ দক্ষ হয়ে উঠছে।
যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীরাও যে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারে, শান্তা ও সেতু তারই উদাহরণ। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন প্রতিবন্ধী জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। কর্মক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে সহায়তাসহ শ্রমবাজারে প্রতিবন্ধীর সক্ষমতাকে কাজে লাগালে তারাও দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারে।
ডিজঅ্যাবল্ড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের (ডিআরআরএ) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাবেয়া সুলতানা বলেন, সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে প্রতিবন্ধীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। বিশেষত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে তাদের যে ধরনের গমনযোগ্যতা প্রয়োজন, তা আশানুরূপভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। অথচ সুযোগ পেলে তারা তাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মে সম্পৃক্ত হতে পারেন।
প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের নানা আইন, নীতি ও কর্মসূচি রয়েছে। প্রতিবন্ধী অধিকার সুরক্ষা আইন ২০১৩-এ তাদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং চাকরি নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে প্রতিবন্ধীদের বড় অংশই প্রাথমিক, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যান। কর্মে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নানা সংকট মোকাবিলা করতে হয়। কারণ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নেই তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ। তার পরও ইচ্ছা, প্রচেষ্টা ও সচেতনতার ফলে অনেক প্রতিবন্ধী পড়াশোনা এবং কর্মক্ষেত্রে মেধা ও দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জরিপে (এনএসপিডি) দেখা যায়, দেশে প্রতিবন্ধীদের ৬৬ শতাংশই কোনো কাজে যুক্ত হতে পারেনি। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতিবন্ধীদের মধ্যে যারা কাজ করছেন তাদের মাত্র ২ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন। ৫৪ দশমিক ৪২ শতাংশ স্বকর্মে নিয়োজিত। গৃহস্থালি বা পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে ১৮ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এনজিওতে কাজ করছে শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ। স্থানীয় সরকার অথবা সরকারের প্রকল্পে কাজ করছে শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসংস্থান কৌশল এবং শ্রমনীতিকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এতে প্রবেশগম্য কর্মক্ষেত্র, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ই-কমার্স, বৈষম্য হ্রাস, ন্যায়সংগত পরিবেশে সহায়ক উপকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবস্থা, প্রবেশগম্য পরিবহন যুক্ত করা হবে। সরকার প্রতিবন্ধীদের আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য বাজার-চাহিদা ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।
ডিআরআরএর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন কালবেলাকে বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) বলা হয়েছে, কাউকে পেছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০১৯-এ প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে সব মন্ত্রণালয়ে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। উন্নয়ন মানেই হচ্ছে দেশের সব মানুষ একসঙ্গে কাজ করবে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধীরাও রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য যদি কোনো কৌশলপত্র না থাকে, কোনো বাজেট বা প্রকল্প না থাকে, তাহলে তারা মূল ধারার কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকবে।
অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা বলেন, অনেক বেসরকারি সংস্থা প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তাদের জন্য যে কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন, সেখানে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে প্রতিবন্ধী যুবদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যদিও এই সমস্যা নিরসনে সরকারি-বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর পরও প্রতিবন্ধী যুবরা নানা কারণে এই প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন না। কারণ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জন্য প্রবেশগম্য নয়। যারা তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন তাদেরও প্রতিবন্ধী সম্পর্কে জানাশোনা কম। আবার একেকজনের প্রতিবন্ধিতা একেক রকম হওয়ায় তাদের পাঠদানের ধরনও ভিন্ন হতে হবে। ফলে সরকারের ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধীদের এর আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল কালবেলাকে বলেন, ‘যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূল স্রোতধারায় যুক্ত করতে সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টা রয়েছে। এজন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ১১ ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে। তাদের সবার শারীরিক সামর্থ্য এক নয়। তাই তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি এক রকম হবে না। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। প্রতিবন্ধিতার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করেই তাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।