১৪ বছর পর লেবার পার্টি যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রক্ষণশীলদের চেয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি লেবার পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহাসিকভাবে উদার হওয়ায় এই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন তারা। তারা মনে করেন, আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং যে ইস্যুগুলো নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য আছে, সেখানেও লেবার সরকার বিষয়গুলো অনুধাবন করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতায় আসার পর লেবার পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অবস্থান কী হবে, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ। যুক্তরাজ্যের এই নতুন সরকারের অধীনে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, সেটি আরও উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা বলেন, লেবার পার্টির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সময় থেকেই বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে লেবার পার্টি এবং দলের স্যার হ্যারল্ড উইলসন, টমাস উইলিয়ামস কেসি ও লর্ড পিটার শোরের মতো নেতাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন, সেটি একটি ঐতিহাসিক বিষয়।
কূটনেতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালবেলাকে বলেন, লেবার পার্টির সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং দরকষাকষি, কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা সহজ হবে। তারা একটি প্রগতিশীল ও জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে লেবার পার্টির মিল রয়েছে। এটি কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এই বিশ্লেষক মনে করেন, দেড় দশক ধরে ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী যে তৎপরতা ছিল, তা এখনো আছে। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও বের হয়েছে এই সময়ে। অভিবাসন ইস্যুতে কনজারভেটিভ পার্টির এক ধরনের আক্রমণাত্মক নীতি ছিল। লেবার পার্টি এগুলো থেকে বের হয়ে এসে হয়তো চেষ্টা করবে কিছুটা মানবিকভাবে বিষয়গুলো সহজ করতে। তিনি বলেন, ব্রিটেন এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। এককভাবে তাদের একটা অর্থনৈতিক শক্তি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আবার তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশের এখন সেই সুযোগটা নেওয়া উচিত।
ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ চার ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। এগুলো হচ্ছে, ডব্লিউটিওর সুযোগ-সুবিধা থাকবে না, জিএসপি সুবিধা থাকবে না, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ। সেখানে আমাদের উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর কাছে এই সুবিধাগুলো যেন থাকে, এটি বাংলাদেশের চাওয়া। যুক্তরাজ্যের আগের সরকার সে ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছিল। লেবার সরকারের অধীনে সেটি আরও বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লেবার পার্টির বর্তমান নেতৃত্বে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চারজন এমপি রয়েছেন। তারাও আমাদের দেশের স্বার্থে কাজ করবেন বলে মনে করেন ড. দেলোয়ার। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য অবস্থান করা বাংলাদেশিদের সিংহভাগই লেবার পার্টির সমর্থক। সে দেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের সক্রিয়তা বেড়েছে, শক্তি বেড়েছে। এটা মূলত লেবার পার্টিকে কেন্দ্র করেই। তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. হুমায়ুন কবীর কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। তারা বৈশ্বিক শক্তি। তাদের ল্যান্ডস্কেপ অনেক বড়। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভালো হবে। কারণ লেবার পার্টি অলওয়েজ লিবারেল।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনের আগে ডেইলি সানের ইলেকশন শোডাউন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। সে সময় একজন অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে তার অবস্থান জানতে চান। জবাবের একপর্যায়ে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে টেনে স্টারমার বলেন, ‘যারা বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে। কয়েকটি দেশের মানুষের এখানে আসা বন্ধ করতে পারি আমরা।’ রুয়ান্ডা অ্যাসাইলাম প্ল্যানকে ‘ব্যয়বহুল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে দেশ থেকে তারা এসেছেন, সেখানেই তাদের ফেরত পাঠানো হবে। আমি নিশ্চিত করব সেটা।’
নির্বাচনের আগে বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে করা স্টারমারের মন্তব্যের বিষয়ে ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, এগুলো কথার কথা। আমার ধারণা এই সরকার অভিবাসন ইস্যুতে আর একটু সহজীকরণের দিকে যাবে। ওখানে কাজের লোকের চাহিদা বাড়ছে। তাদের লোক দরকার। আমাদের লোকজন যদি নিয়মিতভাবে যাওয়ার সুযোগ ব্যবহার করতে পারে, সেখানে সেই বাজার আছে, সুযোগ আছে, সেটা যে সরকারই থাকুক।
তিনি বলেন, অভিবাসীদের নিয়ে মন্তব্যের পর উনি (স্টারমার) যেভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশিদের কন্ট্রিবিউশন তুলে ধরেছেন সেটি প্রশংসনীয়। সেটির একটা ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। তবে এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আমাদের কাজ করতে হবে বলে মনে করেন হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে হবে। কোথায় কোথায় আমাদের সুযোগ রয়েছে সেগুলো বের করে সামনে এগোতে হবে। এটি এমনি এমনি ঘটবে না। এর জন্য নীতিনির্ধারক, কূটনীতিকদের কাজ করতে হবে।