রাজধানীর বংশালে মিরনজিল্লা কলোনিতে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আউয়াল হোসেনের নেতৃত্বে শতাধিক মানুষ হামলা চালায়। এতে কলোনির অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে সাতজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে কলোনি রক্ষার দাবিতে করা সংবাদ সম্মেলনের পর এই হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাউন্সিলর ও তার লোকজন ধারালো দা, চাপাতি, লাঠি নিয়ে হামলা চালায়। তারা কলোনির ঘরবাড়ি, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে। এতে কলোনির অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এ সময় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা হরিজনদের সহযোগিতায় একটি বাসায় আশ্রয় নেন। হরিজনরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুললে কলোনি থেকে কাউন্সিলর ও তার লোকজন বের হয়ে যেতে বাধ্য হন। এর পরও বেশ কিছুক্ষণ পাল্টাপাল্টি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ চলে। সে সময় ডিএসসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানকে নিরাপদে পুলিশ প্রহরায় বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বের হয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের উদ্দেশে বলেন, এখানে কী হয়েছে আমি দেখেছি। এখানকার লোকজন আমার স্টাফ। তাদের নিরাপত্তা আগে, তারপর সব।
হরিজনদের পক্ষে রিটকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি বলেন, গতকাল সকালে তাদের ভূমি রক্ষা কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন হয়। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট ও কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন কলোনিতে আসেন। কলোনির বাসিন্দাদের সঙ্গে কাউন্সিলর ও ম্যাজিস্ট্রেটের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কাউন্সিলরের লোকজন কলোনিতে হামলা শুরু করে। তারা হরিজনদের ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙচুর করে। তাদের হামলায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।
কলোনির বাসিন্দা টিটু সরকার বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সংবাদ সম্মেলন শেষ করি। এরপর পুলিশ ও শতাধিক লোক নিয়ে কাউন্সিলর এবং ম্যাজিস্ট্রেট আসেন এখানে। তাদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কাউন্সিলরের লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়। পরে বংশাল থানা পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। বংশাল থানার ওসি মাইনুল ইসলাম পল্লি পরিদর্শন করেন।
এ সময় স্থানীয়দের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত। আমাদের ফোর্স পাঠাতে বলা হয়নি। বললে আমরা আসতাম। তাতে এই ঘটনা ঘটত না। আমরা কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে বসব। ঘটনাটি তদন্ত হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি বলেন, এখানে কী ঘটেছে, তা আপনারা দেখেছেন। সিটি করপোরেশন আজ যে কর্মসূচি নিয়ে এখানে এসেছে, তা অবৈধ। এরই মধ্যে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করেছি। যারা আজ এই হামলা করেছে, কাউন্সিলরসহ তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।
প্রসঙ্গত, বংশালের আগা সাদেক লেনের মিরনজিল্লা কলোনি উচ্ছেদের জন্য সম্প্রতি নোটিশ দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এদিকে মিরনজিল্লা হরিজন কলোনিতে উচ্ছেদ অভিযানের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেছেন আপিল বিভাগ। এ বিষয়ে আইনজীবী অনীক আর হক বলেন, কলোনিতে ডিএসসিসি নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। এজন্য হরিজন কলোনিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ মোতায়েন করতে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেয়। গত মঙ্গলবার সিটি করপোরেশন এ চিঠি দেয়। পাশাপাশি স্থানীয় কাউন্সিলরকে এ বিষয়ে সহায়তা করতে বলা হয়। এরপর গতকাল হরিজন পল্লিতে আবারও অভিযান শুরুর উদ্যোগ নিলে সেখানে বসবাসরত হরিজনদের পক্ষে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সিটি করপোরেশনের অভিযানের ওপর স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। এর আগে গত ১৩ জুন কলোনিতে উচ্ছেদ অভিযানের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি বসবাসের বিকল্প ব্যবস্থা না করে হরিজনদের উচ্ছেদ না করতে নির্দেশ দেন আদালত।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণ চন্দ্র দাশ বলেন, ২০১৭ সালে পাঁচতলা একটি পুরোনো বিল্ডিং ভেঙে ফেলেছিল। সেখানে ৫০ পরিবার ছিল। ওই ৫০ পরিবারের কয়েকজনকে রাস্তায় টিনশেড বানিয়ে দেওয়া হয়। বাকিরা বিল্ডিংয়ের ছাদে টিনশেডের বাসা করে আছে। তাদের মধ্যে এত বছর পর ১৬-১৭ জনকে বাসা দিচ্ছে। এখন এটি দেখিয়ে কোর্ট থেকে আবার উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আসতে পারে তারা। তাই আমরা চাই সবার একসঙ্গে পুনর্বাসন হোক। তার আগে উচ্ছেদ করা যাবে না।
এদিকে মিরনজিল্লায় কলোনিতে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন।
এ বিষয়ে জানতে কাউন্সিলর আউয়াল হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত ও মনিন্দ্রা কুমার নাথের নেতৃত্বে গতকাল রাতে একটি প্রতিনিধিদল মিরনজিল্লা হরিজন পল্লি পরিদর্শন করে। সেখানে হামলার শিকার হরিজনদের খোঁজখবর নেন তারা। এ সময় তারা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও হরিজন ঐক্য পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ১৩ জুলাই সারা দেশে মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা করেন।