অ্যাপের নাম নিরাময়। মোবাইলের এ অ্যাপ দিয়েই স্বাস্থ্যসেবা এখন হাতের মুঠোয় ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায়। সেবা পাচ্ছেন অন্তঃসত্ত্বা, প্রসূতিসহ সব বয়সী নারী ও শিশু।
স্মার্ট মোবাইলের প্লে-স্টোরে গিয়ে সহজেই ডাউনলোড করা যাচ্ছে অ্যাপটি। রেজিস্ট্রেশন করে আবেদনের পর সেখানে সহজেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। প্রসূতি কল্যাণ, শিশু কল্যাণ, রোগী কল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্য, সাপে কাটা এমনকি আত্মহত্যা ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের মতো বিষয়েও সেবা মিলছে এ অ্যাপসে। ঘরে বসে হাতের মুঠোয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় খুশি সেবাপ্রত্যাশীরা।
নিরাময় অ্যাপস সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস হরিণাকুণ্ডুতেই। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় স্থানীয় তাসলিমা খাতুনের। বছর ঘুরতেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ওই কিশোরী। গর্ভকালীন বিষয়ে পরামর্শের জন্য গ্রামের দাদি-নানিরাই ছিল তার একমাত্র ভরসা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা হাসপাতাল ছাড়াই অতিকষ্টে ৯ মাস পার করে; কিন্তু প্রসবের সময় দেখা দেয় জটিলতা।
ছলছল চোখে তাসলিমা জানান সেই অভিজ্ঞতার কথা। বলেন, ‘দিনটি ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যা থেকে ব্যথা শুরু। আমার চিৎকারে মা পাশের বাড়ি থেকে দাই আমেনা দাদিকে ডেকে আনেন। হারিকেন জ্বালিয়ে তিনি পাশে বসে থাকলেন। রাত ৯টা থেকে রক্তে বিছানা ভেসে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল মরে যাব। আমেনা দাদি যখন জানালেন অবস্থা ভালো না, তখন মা-বাবা কোনোমতে ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়া যান। সেখানে সন্তান প্রসব করি; কিন্তু ডাক্তারসহ সবাই বলছিল শিশুটি অপুষ্ট।
জন্মের পর থেকেই অসুখ-বিসুখ লেগে আছে। একদিন শুনলাম, জন্মের পরই নাকি টিকা দিতে হয়। এরে-ওরে জিজ্ঞাসা করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে টিকা দিলাম। এখন আগের চেয়ে ভালো আছে বাচ্চাটা।’
নারীর স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তাসলিমার এমন বক্তব্য শুনে হাতের মুঠোয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন স্থানীয় ইউএনও সুস্মিতা সাহা। এরপর বদলে যায় প্রেক্ষাপট। ভাগ্য বদলায় হরিণাকুণ্ডুর হাজারো নারীর। তাদের নিত্যদিনের এমন চিরাচরিত স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা প্রশাসনের মোবাইল অ্যাপ নিরাময়ের যাত্রা শুরু। এরই মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
উপজেলা তথ্য ও যোগাযোগ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে অ্যাপসটি চালু হয়। স্মার্ট মোবাইলের প্লে-স্টোর থেকে এ পর্যন্ত এটি ডাউনলোড করেছেন পাঁচ শতাধিক নারী। আর নিয়মিত সেবা নিচ্ছেন ৪৮৭ প্রসূতি মা। এ ছাড়াও অ্যাপসটিতে ইপিআই টিকা গ্রহীতা হিসেবে এন্ট্রি হয়েছে ৭৩২ জনের। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের মাধ্যমে খুব সহজেই নিশ্চিত করা হচ্ছে তাদের জন্মনিবন্ধন সেবা।
রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সেবাগ্রহীতা জরিনা খাতুন বলেন, আমি ২৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। শুরু থেকেই নিরাময় অ্যাপস ইনস্টল করে সেবা নিচ্ছি। কখন কী করতে হবে, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে সবই বলে দিচ্ছে নিরাময় অ্যাপস, যার কারণে আমি এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ।
২নং জোড়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সৌরভ কুমার কুণ্ডু জানান, আগে নতুন জন্মনিবন্ধনের জন্য শিশুকে চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। এখন স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাময় অ্যাপসে টিকা গ্রহীতার তথ্য এন্ট্রি করামাত্রই গ্রাম পুলিশের সহায়তায় দ্রুত জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করি। ফলসী ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মী শাহানা ইয়াসমিন জানান, যখন যে বাচ্চা টিকা নিতে আসে, তখনই তার তথ্য নিরাময়ে এন্ট্রি করি।
ইউএনও সুস্মিতা সাহা বলেন, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতেই স্বাস্থ্যবিষয়ক এ মোবাইল অ্যাপসটি চালু করা হয়েছে। হরিণাকুণ্ডুর মানুষকে কেন্দ্র করে ডিজাইন করা হলেও পুরো দেশেই তা চালু করা সম্ভব। জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে মানসিক বিপর্যস্ততায় সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলিংসহ যে কোনো স্বাস্থ্যসমস্যায় সবসময় নিরাময়কে যাতে কাছে পায়, সেজন্য জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে কাজ করে যাচ্ছি।
মন্তব্য করুন