আদালতে বিচারপ্রার্থীদের কমপক্ষে ২০ ধরনের দুর্ভোগ ও হয়রানি চিহ্নিত করেছে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার ব্যবস্থার পদ্ধতিগত কারণ, আদালতের অব্যবস্থাপনা, আইনজীবী বা আইনজীবী সমিতির দ্বারা, কখনো বা আদালতের সহায়ক কর্মচারীর কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব হয়রানি ও দুর্ভোগ লাঘবে এক ডজনের বেশি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করেছে।
হয়রানি ও দুর্ভোগ বিষয়ে সংস্কার কমিশন একটি জরিপও পরিচালনা করেছে। জরিপে মতামত প্রদানকারীর ৯০ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করে আদালতের কর্মচারীরা হয়রানি করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ১১ হাজার ২২৫ জনের মধ্যে হয়রানি করেন মর্মে মতামত দিয়েছেন ১০ হাজার ২০৩ জন। এ ছাড়া আদালতের কার্যক্রম হয়রানিমূলক বলে মনে করেন ৭৫ শতাংশের বেশি আইনজীবী। এক্ষেত্রে জরিপে অংশ নেওয়া ২২২ আইনজীবীর মধ্যে হয়রানিমূলক মর্মে মতামত দিয়েছেন ১৭৩ জন। পাশাপাশি আইনজীবীরা আদালতের সময় নষ্ট করেন মর্মে মতামত দিয়েছেন ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ। এক্ষেত্রে জরিপে অংশ নেওয়া ১০ হাজার ৬৬২ জনের মধ্যে সময় নষ্ট করেন বলে মতামত দিয়েছেন ৮ হাজার ৫১১ জন।
‘আদালতের ব্যবস্থাপনাজনিত ঘাটতিতে দুর্ভোগ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার আইনজীবী ও পক্ষগণ আদালতে হাজির হওয়ার পর জানতে পারেন, বিচারক ছুটিতে, আদালতের কার্যক্রম হবে না। এরূপ পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ ব্যয় এবং দুর্ভোগ হয়। আদালতগুলোয় ঐতিহ্যগতভাবে আগে কোনো দিবস উদযাপন হতো না। আদালত প্রাঙ্গণে নানাবিধ উৎসব, অনুষ্ঠানের আয়োজন পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। এগুলোর কারণে একদিকে আদালতের বিচারিক
কাজ বিঘ্নিত হয়, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে বিচারকদের সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়।
প্রকাশ্য আদালতে তারিখ না দেওয়ায় দুর্ভোগ হয় উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ধার্যকৃত দিনে সময় বাড়াতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রায়ই দরখাস্ত দাখিল করতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পেশকার মামলার নথি এজলাসে উপস্থাপন না করে খাস কামরা বা চেম্বারে নিয়ে দরখাস্তটি নিষ্পত্তি করে নতুন তারিখ দেন। মামলার তারিখ বা অন্যান্য তথ্যের জন্য পক্ষগণ পুরোপুরি আইনজীবী বা আইনজীবীর সহকারীর ওপর নির্ভরশীল। তাদের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া মামলার তারিখ বা তথ্য জানার অন্য কোনো উৎস নেই। এসব কারণে মানুষকে অর্থ ও সময় ব্যয় করাসহ অনেক দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়।
আসামির পরিচয় যাচাইয়ে সমস্যা ও দুর্ভোগ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা দায়ের অথবা শুনানিকালে কোনো পক্ষ, আসামি বা সাক্ষীগণের তাৎক্ষণিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে। এরূপ ছোট একটি বিষয়ের জন্য আদালত পুলিশকে যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ প্রদান করেন। এতে পুরো বিষয়টি বিলম্বিত হয়। এতে বলা হয়েছে, দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলায় বড় পরিসরে বহুতল আদালত ভবন নির্মিত হলেও বিচারপ্রার্থী মানুষ ও আইনজীবীর তুলনায় লিফটের পরিমাণ খুবই কম। এতে বলা হয়েছে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ব্যতীত অধস্তন সব আদালত প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে অবকাশকালীন ছুটির কারণে বন্ধ থাকে। এ সময়ে দায়িত্বে থাকা ভ্যাকেশন জজ সাধারণত মিস কেস ব্যতীত অন্য কোনো শুনানি গ্রহণ করেন না। এর ফলে সাজা পরোয়ানামূলে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জামিন শুনানি করা সম্ভব হয় না। চেকের মামলায় দণ্ডিত আসামি টাকা দাখিল করত আপিলের শর্তে জামিন শুনানি করার সুযোগ পায় না।
আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে সৃষ্ট হয়রানি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালত বর্জনের ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষ চরম হয়রানি ও দুর্ভোগের সম্মুখীন হন। আদালত বর্জন আইনজীবীদের কাছ থেকে কাম্য হতে পারে না। বিচারকের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে আইনানুগ পন্থায় এটি কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারে। এতে বলা হয়েছে, আইনজীবী সমিতি সদস্য আইনজীবীর মৃত্যুর দিন তার সম্মানার্থে ডেথ রেফারেন্স অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং এ কারণে আদালতের বিচারকার্য মুলতবি রাখা হয়। বছরের একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় এতে ব্যয় হয়। আইনজীবীদের ব্যক্তিগত মামলায় বিপক্ষের হয়ে বারের কোনো সদস্য মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না বলে অনেক আইনজীবী সমিতিতে সিদ্ধান্ত রয়েছে। এটি বেআইনি এবং অন্যায্য।
বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হলে তার প্রতিকার ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত ও দুর্বল উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, শুনানির সময় উপস্থিত না হওয়া, বিপক্ষের সঙ্গে লেনদেনে জড়িয়ে যাওয়া কিংবা মক্কেলের সঙ্গে অনৈতিক বা প্রতারণামূলক কোনো কাজের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী মক্কেল দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আইনজীবীর এরূপ হয়রানি ও দুর্ভোগের বিষয়ে বার কাউন্সিলে বর্তমানে যে প্রতিকার ব্যবস্থাপনা রয়েছে, এটি খুবই অপর্যাপ্ত। একটি উপজেলা বা জেলা থেকে ঢাকাস্থ বার কাউন্সিলে এসে অভিযোগ দায়ের করা যে কোনো বিচারপ্রার্থীর জন্য কষ্টদায়ক এবং বিড়ম্বনাপূর্ণ।
আইনজীবী কর্তৃক হয়রানি ও দুর্ভোগ
আদালত মামলার কোনো একটি পক্ষের অবহেলা বা বিলম্বের কারণে অন্য পক্ষকে খরচ বা জরিমানা পরিশোধের আদেশ প্রদান করেন। কিন্তু এসব খরচ বা জরিমানার টাকা উত্তোলন করে আইনজীবীরা ভাগ করে নেন। অনেক সময় বিচারপ্রার্থী আইনজীবীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে মামলা ফেরত নিয়ে অন্য আইনজীবী নিযুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এনওসি ইস্যু করে মামলা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা করেন না। ফৌজদারি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পাবলিক প্রসিকিউটরদের রাষ্ট্রপক্ষে যাবতীয় দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তারা গাফিলতি করেন। মামলার প্রতি যথাযথ যত্ন নেন না। সরকারি আইনজীবীদের একটি অংশ মামলায় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মামলার পক্ষগণের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করে মর্মে অভিযোগ বিভিন্ন সময় শোনা যায়। অনেক সময় এরূপ অভিযোগের কোনোরূপ তদন্ত হয় না কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
আদালতের কর্মচারী কর্তৃক হয়রানি ও দুর্ভোগ
আদালতের কর্মচারী বিশেষত পেশকার, সেরেশতাদার, অফিস সহায়ক, নকলখানার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসহযোগিতা, দুর্ব্যবহার ও অর্থ দাবির অভিযোগ বেশ পুরোনো। কমিশনের অনলাইন জরিপেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। কমিশনের জরিপে অংশ নেওয়া ১১ হাজার ২২৫ জন নাগরিকের ৯০ শতাংশই আদালতের কর্মচারীর হয়রানি করেন মর্মে জানিয়েছেন। একই জরিপে ৮৪ দশমিক ৯০ শতাংশ নাগরিক আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান মর্মে মত ব্যক্ত করেছেন।
হয়রানিমুক্ত বিচার ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা
কমিশনের জরিপে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ হয়রানিমুক্ত বিচার বিভাগ চান মর্মে মতামত দিয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ১১ হাজার ৮২১ জনের মধ্যে ১০ হাজার ৬৫৬ জন এমন মতামত দিয়েছেন। এ ছাড়া ৮৭ শতাংশের বেশি আইনজীবী, ৬৮ শতাংশের বেশি আদালতের সহায়ক কর্মচারী এবং ৮৭ শতাংশের বেশি বিচারক হয়রানিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা চান। মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন জরিপের এই মতামতে স্পষ্ট, বিচার বিভাগের অংশীজন ও সেবাগ্রহীতারা হয়রানিমুক্ত বিচার চান। আদালতের ভেতরে এবং বাইরে বিচারিক সেবার সব ধাপকে হয়রানিমুক্ত করার বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কমিশনের সুপারিশ
আদালত প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানাদি বন্ধ এবং বিচার বিভাগে বিভিন্ন দিবস উদযাপন বা অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি আয়োজনের ক্ষেত্র সীমিত করতে হবে। বিচারক ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ, মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বৃদ্ধির দরখাস্তের ক্ষেত্রে বাদীর উপস্থিতিতে শুনানির মাধ্যমে আদেশ এবং মামলার তারিখ ও প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি জানার জন্য অনলাইনভিত্তিক ই-কজলিস্ট চালু করতে হবে। মামলার পক্ষগণের জাতীয় পরিচয়পত্র তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের গেটওয়ে সার্ভারে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে চুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আদালতের উন্মুক্ত চত্বরে দিনের বেলায় মাদক পোড়ানো বন্ধ, আদালতের আদেশ যারা প্রদত্ত ‘খরচ’ বা ‘জরিমানার টাকা’ আইনজীবীর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট পক্ষ কর্তৃক গ্রহণের কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে সার্কুলার জারি করতে হবে।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, মামলার আদেশ, রায়, ডিক্রিসহ অন্যান্য কাগজপত্রের জাবেদা নকল প্রদানের ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধে সরবরাহ পদ্ধতি সহজীকরণ করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণে শিশুদের জন্য ব্রেস্টফিডিং কক্ষ এবং প্রতিবন্ধীদের চলাফেরার সুবিধার্থে লিফট ও আদালতকক্ষে অনুকূল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আদালত ভবনে পর্যাপ্ত লিফট এবং লিফটম্যানের ব্যবস্থা করাসহ জেলা পর্যায়ে আদালত বর্জন কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট এবং বার কাউন্সিলের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে ওই বছরে প্রয়াত সব আইনজীবীর সম্মানার্থে অনুষ্ঠান আয়োজন, আইনজীবীদের ব্যক্তিগত মামলায় বিপক্ষের হয়ে বারের কেনো সদস্য মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না মর্মে অলিখিত প্রচলন থাকলে সেসব বারের বিষয়ে বার কাউন্সিল কর্তৃক তদন্তপূর্বক দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনজীবীদের অসদাচরণ-সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত, শুনানি ও নিষ্পত্তির বিষয়ে জেলা পর্যায়ে একটি প্রতিকার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। ক্লায়েন্টের ইচ্ছা অনুসারে মামলা ফেরত না দেওয়াও বা এনওসি ইস্যু না করার বিষয়ে বিড়ম্বনা দূরীকরণার্থে নির্দেশনা প্রদান এবং সরকারি আইনজীবী কর্তৃক মামলায় গাফিলতি ও অপেশাদার আচরণের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তিতে একটি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করতে হবে।