বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ৭ নম্বর কাঁঠালতলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনবারের নির্বাচিত সদস্য অঞ্জন ভট্টাচার্য। বাড়ির পাশে স্থানীয় নলী বাজারে একটি মুদি-মনিহারি দোকানের আয় থেকে চলত তার সংসার। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এ দোকানে। অঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘অপরাধ’ তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক। যদিও কোনো দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না তিনি।
সম্প্রতি ওই দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙচুরের নানা চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। প্রথমদিকে দোকানটি দখলে নেওয়ার পর চব্বিশের জুলাইয়ে শহীদ আবু সাঈদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সংবলিত ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়। ঘোষণা দেওয়া হয় বিএনপির কার্যালয় হিসেবে। পরে অবশ্য প্রশাসনের চাপে সেখান থেকে টেবিল-চেয়ার নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে বিএনপির কার্যালয় করা হয়েছে। কিন্তু দোকানটি এখনো স্থানীয় বিএনপির এক নেতার দখলে রয়েছে।
শুধু এই দোকান ভাঙচুর বা দখল নয়, স্থানীয় বিএনপির নেতা হাবিবুর রহমানের নির্দেশে তার লোকজন ৬ আগস্ট অঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতেও হামলা চালায়। তারা পানির ট্যাঙ্ক, ঘরের দরজা-জানালা ভাঙচুর, অঞ্জন ভট্টাচার্যকে মারধরসহ তাকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে থাকে। এ সময় প্রাণভয়ে দুপুরের ভাত না খেয়েই বাড়ির পাশের খাল সাঁতরে পালিয়ে যান অঞ্জন ভট্টাচার্য। পরে হাবিবুর রহমানের লোকজন বসতঘরে ঢুকে মূল্যবান মালপত্র, একটি মোটরসাইকেল লুট করে নিয়ে যায়। ভাঙচুর করে ঘরের আসবাব। এমনকি পানি সেচের বৈদ্যুতিক মোটর, গাছের নারিকেল ও সুপারিও নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
সেই থেকে অঞ্জন ভট্টাচার্য বাড়িছাড়া। বিএনপি নেতার ভয়ে এখনো তিনি গ্রামে ফিরতে পারেননি। আজ এখানে তো কাল ওখানে, এভাবেই চলছে তার দিন। কালবেলাকে অঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘৫ আগস্ট পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কাঁঠালতলী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের নির্দেশে তার দুই ছেলে এবং স্থানীয় ফরিদ, তার ছেলে খলিল ও ছিদ্দিক লোকজন নিয়ে তার দোকানে হামলা চালায়। এ সময় দোকানে থাকা ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার মালপত্র ও আসবাব লুটপাট করে নিয়ে যায়। পরে দোকানটিতে ব্যানার টানিয়ে বিএনপি অফিস ঘোষণা করে।’
অঞ্জন ভট্টাচার্যের আরও অভিযোগ, ‘পরদিন ৬ আগস্ট তারা আমার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় নুরুল ইসলামের ছেলে জলিল ঘরে থাকা দলিল-দস্তাবেজসহ মূল্যবান কাগজপত্র আগুনে পুড়িয়ে দেয়। তাদের হুমকি-ধমকিতে সেদিন থেকে স্ত্রী ও বিবাহযোগ্য কন্যাকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারসহ নিরাপদে নিজ বাড়িতে ফিরতে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে অঞ্জন ভট্টাচার্যের অভিযোগের সত্যতা মেলে। তারা বলেন, এখনো বিএনপি নেতা হাবিবের লোকজন বাড়িটির সামনে এসে মহড়া দিয়ে যায়। এমনকি তারা গাছের নারিকেল ও সুপারি নিয়ে যায়।
এলাকায় গিয়ে অভিযুক্ত খলিল, ছিদ্দিক, জলিল কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে মোবাইল ফোনে কথা হয় বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘শুনেছি ৫ আগস্ট অঞ্জন মেম্বারের বাড়িতে হামলা হয়েছে। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম না, ঢাকায় ছিলাম। তা ছাড়া এ ঘটনায় আমি বা আমার পরিবারের কেউ জড়িত নই।’
পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক চৌধুরী মো. ফারুক কালবেলাকে বলেন, ‘ইউপি সদস্য অঞ্জন ভট্টাচার্যের দোকানসহ বাড়িঘরে হামলা ও তার বাড়িতে না থাকার বিষয়টি আমরা লোকমুখে শুনেছি। তাকে বাড়িতে ফেরাতে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দল ও দলের বাইরের কিছু লোক জড়িত আছে। এরই মধ্যে হাবিব চেয়ারম্যানসহ জড়িতদের দলীয় ও প্রশাসনিকভাবে শাসানো হয়েছে। বর্তমানে তার (অঞ্জন ভট্টাচার্য) বাড়িতে ফিরতে কোনো সমস্যা নেই।’
পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, লুটপাট বা অঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়ি ছাড়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তিনি আইনি সহায়তার জন্যও থানায় যোগাযোগ করেননি। তিনি আইনি সহায়তা চাইলে অবশ্যই তাকে সহায়তা করা হবে।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ বরগুনা জেলা শাখার সদস্য সচিব জয়দেব রায় কালবেলাকে বলেন, ‘গত ৫ ও ৬ আগস্ট একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মীরা অঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। সেই সময়ই তিনি প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। এর পরও তার বাড়িতে হামলা হয়েছে। বর্তমানে অঞ্জন ভট্টাচার্য স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন, মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাকে বাড়িতে ফেরাতে এবং সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে আমরা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাই।’
বরগুনা জেলা প্রশাসক শফিউল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব। উনার (অঞ্জন ভট্টাচার্য) সঙ্গেও কথা বলব। তাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা করা হবে।’