এ জেড ভূঁইয়া আনাস
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকাতেই টাকার ছড়াছড়ি!

অর্থনীতি
ঢাকাতেই টাকার ছড়াছড়ি!

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই পরিচালিত হয় রাজধানী ঢাকায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট হেডকোয়ার্টার্স, আন্তর্জাতিক সংস্থার শাখা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ঘেরা এই শহরে টাকার প্রবাহ সবচেয়ে বেশি। ঋণ, আমানত ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকায় টাকার প্রবাহ দেশের সব বিভাগের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। ঢাকার শক্তিশালী অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অব্যাহত ব্যবসায়িক সুযোগের কারণে দেশের প্রায় সব ব্যাংক তাদের মূল বিনিয়োগ ঢাকার দিকে প্রবাহিত করছে। এর ফলে ঢাকায় চলছে টাকার ছড়াছড়ি।

সারা দেশের বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর আমানত ও বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব শেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা, যা তার আগের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ছিল ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি। তিন মাসে আমানত আমানত বেড়েছে ১৮ হাজার কোটিরও বেশি। বিপরীতে গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। যেখানে গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বরাবরের মতো ঋণ বিতরণে গুরুত্ব পেয়েছে শহরাঞ্চলে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ঋণ বিতরণে অনীহা থেকেই গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত আমানতের ৬১ শতাংশই ঢাকা বিভাগের। আর সারা দেশ মিলে মাত্র ৩৯ শতাংশ আমানত সংগ্রহ করতে পেরেছে। একই অবস্থা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৬৮ দশমিক ৪৭ শতাংশই পেয়েছেন ঢাকা বিভাগের গ্রাহকরা। আর সারা দেশের গ্রাহকরা পেয়েছেন মাত্র ৩১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এ ছাড়া দেশের যে পরিমাণ টাকার সার্কুলেশন রয়েছে তার ৭০ শতাংশই হয় ঢাকাকেন্দ্রিক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা দেশের যত বাণিজ্য রয়েছে তার সিংহভাগই পরিচালিত হয় রাজধানীকেন্দ্রিক। অর্থাৎ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার প্রায় সবকটিরই প্রধান কার্যালয় রাজধানীতে। অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামকেন্দ্রিক গড়ে উঠলেও এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অবদান প্রায় শূন্য। দেশের বাণিজ্য বিকেন্দ্রীকরণ না করলে এই অবস্থা থেকে উন্নতি সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগে আমানতের পরিমাণ ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৬১ শতাংশ। আর শুধু ঢাকা জেলায় আমানতের পরিমাণ ৯ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের মোট আমানতের অর্ধেক শুধু এক ঢাকা জেলার। একই অবস্থা ঋণ বিরণের ক্ষেত্রেও।

গত ডিসেম্বর শেষে দেশের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৫২ হাজার ১৯০ কোটি, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর শুধু ঢাকা জেলায় বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক জেলাতেই দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৬৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ঢাকার পরপরই আমানত ও ঋণ বিতরণে অবস্থান করছে দেশের বণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। গত একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা একেবারেই আলাদা। দেশের দক্ষিণ, উত্তর এবং পশ্চিমাঞ্চলের শহর বা গ্রামগুলোর মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রমের অভাব স্পষ্ট। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে গিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তারা ঋণের অভাবে বিপাকে পড়ছেন। গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা এবং অন্যান্য শহরের উন্নয়ন অনেকটাই থমকে গেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য যে বিনিয়োগ সুযোগ পাওয়া উচিত, তা তাদের একেবারেই মিলছে না। যেখানে ঢাকাতে বড় বড় ঋণ সুবিধা এবং বিনিয়োগের প্রাধান্য রয়েছে, সেখানে এই শহরগুলোর উদ্যোক্তাদের জন্য তা প্রায় অবাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের বৃহত্তর অংশে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র হচ্ছে।

তথ্য বলছে, ঋণ বিতরণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। সেখানে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৬৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর পরই রয়েছে খুলনা বিভাগ। যেখানে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, ময়মনসিংহ বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা, বরিশাল বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা ও সিলেট বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঢাকা বিভাগে ঋণ বিতরণ ছিল ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এ সময় চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণ বিতরণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা, খুলনা বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা, রাজশাহী বিভাগে ৬৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা, সিলেট বিভাগে ১৮ হাজার ১০২ কোটি টাকা, বরিশাল বিভাগে ১৮ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১ হাজার ৪ কোটি টাকা ও রংপুর বিভাগে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩৮ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি কালবেলাকে বলেন, আমাদের দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকা এবং চট্টগ্রামে হয়। তাই এসব অঞ্চলে বেশি ডিপোজিট, ঋণ ও বিনিয়োগ হয়। কিন্তু দেশের সব অঞ্চলের উন্নয়ন যেন সমান হয় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন উদ্যোক্তা তৈরি হয়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকেও এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে হবে। ঢাকার তুলনায় অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকবে। তবে সেই পার্থক্যটা বেশি বড় হওয়া উচিত না। ঋণের বিতরণ যেন আরও সহজ এবং টেকসই হয়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য যাতে এ ধরনের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি পায়, সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুর্নীতিবাজকে ভোট  দিয়ে সুশাসনের স্বপ্ন দেখাই আত্মপ্রবঞ্চনা

খেলা দেখতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় ৭ ফুটবল সমর্থক নিহত

শীত আসছে কি না, জানাল আবহাওয়া অফিস

বিএনপি-জামায়াতের তুমুল সংঘর্ষ

ধর্মেন্দ্র পাচ্ছেন মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ

হজের কার্যক্রম নিয়ে নতুন তথ্য জানালেন ধর্ম উপদেষ্টা

বিএনপির নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর

বিএনপির দুপক্ষের তুমুল সংঘর্ষ

একই দলের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন মামা-ভাগনে

নির্বাচিত হয়ে সরকারে গেলে সবার আগে শান্তি ফেরাব : মির্জা ফখরুল

১০

বিশ্বকাপ নিশ্চিত করল বাংলাদেশ

১১

নির্বাচনে বিএনপিকে দুটি চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে : রবিউল আলম

১২

স্বামী জামায়াত আমিরের জন্য ভোট চাইলেন ডা. আমেনা বেগম

১৩

মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীর বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে নতুন তথ্য

১৪

নাগরিক সমস্যার সমাধানে প্রতিশ্রুতি ইশরাকের

১৫

প্রাণ গেল ২ এসএসসি পরীক্ষার্থীর

১৬

আরও ১১ নেতাকে দুঃসংবাদ দিল বিএনপি

১৭

সুখবর পেলেন মোস্তাফিজুর রহমান

১৮

স্থায়ী পুনর্বাসন ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি আমিনুল হকের

১৯

রবিনের ধানের শীষেই আস্থা সাধারণ ভোটারদের 

২০
X