নূর মোহাম্মদ
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৪৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মাউশিকে দুভাগ করার প্রস্তাবে শিক্ষায় ঝড়

কর্মকর্তা-শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ
মাউশিকে দুভাগ করার প্রস্তাবে শিক্ষায় ঝড়

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) ভেঙে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, আর্থিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে গতি আনতে গত ৩ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার কাছে এমন প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার ও সদ্য অপসারিত শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়ের। এমন প্রস্তাবের পর শিক্ষা ক্যাডারে ঝড় উঠেছে। এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নতুন অধিদপ্তরের নামে আমলারা মাউশির কলেজ অংশটুকু দখল করতে চান। ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে জোরালো কর্মসূচি দেওয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ২৭ অনুচ্ছেদে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের জন্য পৃথক অধিদপ্তর গঠনের সুপারিশ ছিল। সেই আলোকে মাধ্যমিক শাখার জন্য ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং কলেজ পর্যায়ের জন্য ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ করার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুক্তি—মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের কার্যক্রম আলাদা করে পরিচালনা করলে প্রশাসনিক কাঠামো আরও গতিশীল হবে। তবে এই প্রস্তাবকে ভিন্নভাবে দেখছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, নতুন অধিদপ্তর করে কলেজ অংশটুকু দখল করতে চাইছেন আমলারা। এর আগে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের পর শীর্ষ পদগুলো আমলারা দখল করেছেন উল্লেখ করে তারা বলছেন, বিতর্কিত ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাও বিতর্কিত। কারণ সেই নীতির কোনো সুপারিশ বিগত ১৫ বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। এখন শুধু পদ দখলের জায়গায় শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন চাওয়া সন্দেহজনক। এটা হলে শিক্ষা খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুটি অধিদপ্তর করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মাউশির আওতায় বর্তমানে ৯টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা শিক্ষা অফিস, ৫১৬টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, ৬৬৬টি সরকারি কলেজ, ৭০৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১০৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১ হাজার ২৩২টি, যার মধ্যে ১ হাজার ৫১৪টি প্রতিষ্ঠান স্কুলের পাশাপাশি কলেজ পরিচালনা করছে। এ পর্যায়ে শিক্ষক সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৯ জন এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ জন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল করার প্রস্তাব এসেছে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে বিআইএম ফাউন্ডেশন রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সি সার্ভিস সেন্টার (বিএফআরসিএসসি) একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। প্রতিবেদনে বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ নামে দুটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সচিব কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর সংস্কার পরিকল্পনা দাখিল করে, যেখানে মাউশিকে দুটি অধিদপ্তরে রূপান্তরের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও কর্মমুখী করতে ২০১৫ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর নামে আলাদা একটি অধিদপ্তর করা হয়। এর আগে মাদ্রাসাগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম মাউশির বিশেষ শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। পৃথক অধিদপ্তর করার পর মাদ্রাসাগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক গতি বেড়েছে। তবে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অধিদপ্তরটির মহাপরিচালক, পরিচালকসহ শীর্ষপদগুলো আমলাদের দখলে চলে গেছে।

মাউশি ভেঙে দুটি বিভাগ করার প্রস্তাবে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এটি শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা তৈরি করবে এবং শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত করে ফেলবে।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১০ সালের শিক্ষানীতিটি বিতর্কিত। এই নীতির কোনো কিছু বাস্তবায়ন না হলেও শুধু অধিদপ্তর করার চেষ্টা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। নীতিটি আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল, বর্তমান সরকার যদি পতিত সরকারের সুপারিশ আমলে নিয়ে মাউশিকে ভাগ করে, তাহলে শিক্ষা খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষার মূল অংশীজন শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই সরকারের এমন প্রস্তাব নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। সরকারের উচিত সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সামনে এগোনো।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার মর্যাদা রক্ষা কমিটির সভাপতি এস এম কামাল আহমেদ বলেন, ‘মাউশিকে দ্বিখণ্ডিত করার এই প্রচেষ্টা শিক্ষা ক্যাডারের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমরা জোরালো কর্মসূচি দেব।’

এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন আরেকটি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) ভেঙে দুটি আলাদা দপ্তর গঠনের প্রস্তাবও আটকে যায়। ডিআইএর আওতায় থাকা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রমকে পৃথক করার দাবি উঠেছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী একটি হবে পরিদর্শন অধিদপ্তর, অন্যটি নিরীক্ষা অধিদপ্তর। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল—দুটি কাজ আলাদা হলে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে, আন্তর্জাতিক মানের তদারকি নিশ্চিত করা যাবে। তবে বিগত সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি ও পদ সৃষ্টি সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা আটকে যায়। দুটি নতুন দপ্তর গঠনের জন্য অতিরিক্ত বাজেট ও জনবল প্রয়োজন হবে, যা বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সম্ভব নয় বলে আপত্তি জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে জটিলতা এবং বাড়তি আমলাতান্ত্রিক স্তরের আশঙ্কা প্রকাশ করে তা আটকে দেয়। এ ছাড়া বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বিন্যাস এবং শিক্ষা ক্যাডার বনাম হিসাবরক্ষণ ক্যাডারের স্বার্থ-সংঘাতের কারণে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে—এমন ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুমোদন স্থগিত রাখে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

‘আমি সেই ভাগ্যবান, যে বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারি’

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ

বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার অলির মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে ৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি

৩ মাসের জন্য এনসিপির ‘নির্বাহী কাউন্সিল’ গঠন

বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ৬৮তম

জাতীয় পার্টি ব্যান্ড করার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে : জাপা মহাসচিব

বার্নাব্যুতে নেমেই আরেকটি রেকর্ড নিজের করে নিলেন আর্জেন্টিনার ‘মাস্তান’

একাদশে ভর্তিতে যাদের আবেদন বাতিলের নির্দেশ

১০

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা 

১১

আসছে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স, দাম কত জানেন?

১২

নারী শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট ও দোয়া চাচ্ছেন ডাকসুর এজিএস পদপ্রার্থী মায়েদ

১৩

এয়ারলাইনসের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ / বিদেশ যেতে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন হোসাইন

১৪

প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, যে যোগ্যতা দরকার

১৫

মাঝআকাশে বোতল-ব্যাগে মলমূত্র ত্যাগ করলেন যাত্রীরা

১৬

ইরানের পাল্টা হামলা, ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন ৫৩ হাজার ইসরায়েলি

১৭

যোদ্ধাদের সামরিক প্রধানের পর মুখপাত্রের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ইসরায়েল

১৮

সবুজায়ন হচ্ছে রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি

১৯

বিইউবিটির আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে ৮ প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

২০
X