আদর শর্মা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

উমেদারদের আবদার মেটালেই পেছায় মামলা!

চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত
চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত। ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত। নগরী ও জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের ভাষ্য, তাদের মনস্তত্ত্বে এই আদালত সম্পর্কে গড়ে উঠেছে এক মিশ্র অনুভূতি। একদিকে কোনো কোনো ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে সম্পত্তি ক্রোক-তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের মতো কঠোর পদক্ষেপ ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি, অন্যদিকে কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আদালতের অভ্যন্তরে কয়েকজন উমেদারের (সরকারি কর্মচারী নন, পেশকার ও সেরেস্তাদারের সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত) অদৃশ্য প্রভাব বিস্তার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে, যা অনেক বিচারপ্রার্থীর মধ্যে হতাশার পাশাপাশি নানান প্রশ্নের উদ্রেক করছে।

ব্যাংকার, আইনজীবী ও আদালতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নথি ব্যবস্থাপনা, আদেশ সংগ্রহ, ওয়ারেন্ট ও নিলাম কার্যক্রমে অনিয়ম এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে এই অর্থঋণ আদালত।

চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে গত মঙ্গলবার একদল আইনজীবী ও ব্যাংক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নথি সংগ্রহ, আদেশ পাওয়া কিংবা ওয়ারেন্ট কার্যক্রম চালানো এখন এক ধরনের ‘প্রেশার টেস্ট’-এ পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবী মীর শফিকুল কবীর কালবেলাকে বলেন, ‘আমি নিয়মিত অর্থঋণ আদালতে মামলা পরিচালনা করি। উমেদারদের হাতে পুরো প্রক্রিয়া যেন জিম্মি। নথি চাইলেও টাকা দিতে হয়, আবার আদেশ তুলতে গিয়েও টাকা লাগে। টাকা ছাড়া সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এতে মক্কেলদের কাছে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১-এ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা উমেদার নুরু (এজলাস) ও হারুন (সেরেস্তা) আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংকার ও আইনজীবীর অভিযোগ, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা ঋণখেলাপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাদীপক্ষের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছেন।

এ প্রসঙ্গে এক ব্যাংক ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) কালবেলাকে বলেন, ‘ব্যাংকের স্বার্থে আদালতে গেলে উমেদারদের ধমক শুনতে হয়। আমরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারি না, এতে আমাদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উমেদার নুরু ও হারুন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের আদালতের আদেশ পাঠান, গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি লুকিয়ে রাখেন এবং ওয়ারেন্ট ও নিলাম কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেন। এ ছাড়াও ৭(১) ধারার বিজ্ঞাপন নথি সংযুক্ত না করা, নকল কাগজপত্র সরবরাহে গড়িমসিসহ নানা অনিয়মে তাদের যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের এক সহকারী বলেন, ‘দীর্ঘদিন চাকরির সুবাদে নুরু ও হারুন অনেক বিষয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করেন, যা বাদীপক্ষের জন্য সমস্যা তৈরি করে।’

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিন আদালতের নথি থেকে আদেশের ছবি তোলা, বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখা এবং হাসি-তামাশায় ব্যস্ত থাকতেও দেখা গেছে উমেদার নুরু ও হারুনকে। এক আইনজীবীর ভাষ্য, নথি চাইলে ধমক দেওয়া হয়। কখনো কখনো মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়। এতে বিচারিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আদালতের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, উমেদার হারুনের বিরুদ্ধে প্রতি মাসে ব্যাংকার, আইনজীবী ও ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, উমেদার নুরু ২০১৯ সালের আগে আদালতে কর্মরত থাকাকালে নথি বাসায় নেওয়া ও সমন বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। একটি প্রতারণার মামলায় সাজা পাওয়ার পর কয়েক বছর বাইরে থাকলেও সম্প্রতি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি আবার আদালতে যুক্ত হন।

একটি ব্যাংকের প্যানেলভুক্ত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত কোর্ট ফি দিই। অথচ ঋণখেলাপিরা উমেদারদের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে, ফলে বাদীপক্ষের মামলা পিছিয়ে যায়।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি হাসান আলী কালবেলাকে বলেন, ‘আদালতের ভেতরে স্পষ্ট অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। উমেদারদের অনেকের বিরুদ্ধে স্পেসিফিক (সুনির্দিষ্ট) অভিযোগ ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) করা হয়েছে এবং আদালত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তবে যাদের সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাদের নাম এই মুহূর্তে স্মরণে নেই। জেনে আপনাকে (এই প্রতিবেদক) জানাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থঋণ আদালত থেকে উমেদারদের বিরুদ্ধে মৌখিক বা লিখিত কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। অভিযোগ আসলে বার ও বেঞ্চে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবে আদালতপাড়ায় উমেদারদের কার্যক্রম নিয়ে কথাবার্তা রয়েছে।’

উমেদাররা সরকারি কর্মচারী নন জানিয়ে হাসান আলী বলেন, ‘তারা পেশকার ও সেরেস্তাদারের সহকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আদালতে এত বেশি প্রেসার (চাপ) থাকে যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সামলানো কঠিন হয়ে যায়। তাই তাদের ব্যক্তিগত সহযোগিতার জন্য উমেদারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ গেলে জেলা জজ প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’

আদালতের ভেতরের জটিলতা ও উমেদারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উমেদার নূর হোসাইন কালবেলাকে বলেন, ‘আমি সবাইকে সাহায্য সহযোগিতা করি। যারা আসে, যেভাবে দেওয়ার দরকার সেভাবে দিই। অনেকে দেখা যায়, নথি চেম্বারে আছে, আদেশ হয়নি। এভাবে যদি দিই, তারা খুশি হয়। আদালতের আদেশের ছবি আগেভাগে খেলাপিদের কাছে পাঠানোর অভিযোগ সত্য নয়। আদেশের কপি আইনজীবী বা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজেই সংগ্রহ করে। সবাইকে খুশি করতে পারি না। বদনাম করার জন্য এসব অভিযোগ উঠেছে। আমি চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১-এ দায়িত্বে আছি।’

অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগ ওঠা আরেক উমেদার হারুন-উর-রশীদ বলেন, ‘এত বড় জায়গায় বসে এসব করা কি সম্ভব? আমি সবসময় সেবা দিয়ে আসছি। জজ সাহেব, অ্যাডভোকেটদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি অসহযোগিতা করছি কি না। এসব অভিযোগ বানোয়াট। আমার পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে এসব মিথ্যে অভিযোগ তৈরি করা হচ্ছে।’

উমেদারদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল হক আখন্দ (বাহার) কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। অর্থঋণ আদালতের অফিসার আলাদা, আদালত আলাদা। এসব বিষয় অর্থঋণের জজরা বলতে পারবেন।’ যদিও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থঋণ আদালতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সব রেকর্ড ভেঙে দেশে স্বর্ণের দামে ইতিহাস

দুই দেশ থেকে ফেরত এলো ৫৬০০ পোস্টাল ব্যালট

বাবা হতে চলেছেন সৌম্য সরকার

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমিরের সম্মানে যে ২ আসন ছাড়ল ইসলামী আন্দোলন

শুধু পড়াশোনার চাপ নয়, শিশুদের আগ্রহের বিষয়টিতে উৎসাহ দেওয়া জরুরি

ফেব্রুয়ারির শুরুতেই যেভাবে মিলবে ৪ দিনের ছুটি

আমার কর্মীদের ভয়ভীতি দেওয়া হচ্ছে : মহিউদ্দিন আহমেদ

আলিফ হত্যা মামলা / নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন চিন্ময় ব্রহ্মচারী

আমির হামজার সকল ওয়াজ-মাহফিল স্থগিত ঘোষণা

ভারতীয়দের ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা প্রত্যাহার দুই দেশের

১০

পঞ্চগড়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির ‘হ্যাঁ যাত্রা’ ক্যাম্পেইন

১১

শাকসু নির্বাচন নিয়ে উত্তাল শাবি

১২

খড়িবাহী ট্রাকের চাপায় প্রাণ গেল মা-মেয়ের

১৩

দেশে প্রথম বেস আইসোলেশন প্রযুক্তিতে ফায়ার সার্ভিস ভবন নির্মাণ করছে গণপূর্ত

১৪

সাইড দিতে গিয়ে ট্রাকের নিচে মোটরসাইকেল, মা-মেয়ে নিহত

১৫

নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে মাজআসের গোলটেবিল আলোচনা সভা

১৬

একই গ্রুপে ভারত-পাকিস্তান, বাংলাদেশের সঙ্গে কারা?

১৭

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল পাকিস্তান, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৮

যে দুর্গম এলাকায় র‌্যাবের ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা

১৯

ফের মা হচ্ছেন বুবলী? গুঞ্জনের জবাবে নায়িকার ‘রহস্য’

২০
X