

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসন সমঝোতা ইস্যুতে চাপে পড়েছে গণঅধিকার পরিষদ। বিএনপির সঙ্গে একটি আসনে সমঝোতা হলেও তা মেনে নিতে পারছে না দলের বড় অংশই। এ সিদ্ধান্ত ঘিরে দলটির ভেতরে দেখা দিয়েছে তীব্র মতবিরোধ। পাল্টাপাল্টি বিবৃতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এবং বহিষ্কারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এ অবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাঠের রাজনীতিতে—দলের প্রতীক ট্রাক মার্কার প্রার্থীরা ভোটারদের সামনে পড়ছেন বিব্রতকর অবস্থায়।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২২ ডিসেম্বর গণঅধিকার পরিষদের সর্বোচ্চ ফোরাম উচ্চতর পরিষদ ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ সভায় ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের পরদিনই দলের সভাপতি নুরুল হক নুর ও রাশেদ খানের উদ্যোগে বিএনপির সঙ্গে দুই আসনে সমঝোতায় যায় দলটি। এতে দলের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং একাংশের নেতারা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ জানান। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২৭ ডিসেম্বর, যখন দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দেন। এ ঘটনায় গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায়। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নেওয়া সমঝোতা ও শীর্ষ নেতার দলত্যাগ—দুটি মিলিয়ে নির্বাচনের মুখে দলটির ভেতরে অনাস্থা ও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটে আরও বড় ঘটনা। দলের দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গণঅধিকার পরিষদ কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা বা জোট করেনি। তারা এককভাবে নির্বাচন করছে, কারও ব্যক্তিগত সমঝোতা থাকলে সেটা দলের সমঝোতা নয়। এরপরই পাল্টা আরেক বিবৃতিতে এটি নাকচ করে দেন দলের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘ভুয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। গণঅধিকার পরিষদ ফ্যাসিবাদের কঠিন সময় থেকেই যুগপৎ আন্দোলন থেকেই বিএনপির সঙ্গে ছিল, আছে, আগামীর জাতীয় সরকারেও থাকবে।’
এরপর দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা হাসান আল মামুনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘জনমনে বিভ্রান্তি, সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে জড়িত’ থাকার অভিযোগে দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে শাকিল উজ্জামান এবং দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্যরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে বহিষ্কার করার এখতিয়ার রাখেন না। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের প্রেস উইংয়ের গ্রুপ থেকে শাকিল উজ্জামানকে বের করে দেন বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান। এ নিয়ে নেতাকর্মীরা বলছেন, যিনি দলত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন তিনি কীভাবে দলের দপ্তর সম্পাদককে দলীয় কোনো গ্রুপ থেকে বের করতে পারেন।
এ বিষয়ে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান খান বলেন, ‘সংগঠন কারও ব্যক্তিগত বা পৈতৃক ভিটামাটি হলে সব জায়েজ। এটা ভুয়া প্রেস রিলিজ। আমাদের গঠনতন্ত্রের নিয়মে তাকে (শাকিল উজ্জামান) অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই।’
দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আবু হানিফ বলেন, প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ, নির্বাহী সংসদ, দল মনোনীত সব প্রার্থী ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে শাকিল উজ্জামান স্বাক্ষরিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এটি শতভাগ সঠিক ও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত সিদ্ধান্তই গণঅধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত। এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে দপ্তর সম্পাদককে অব্যাহতি দেওয়া চরম অন্যায়। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি আকারে জানানোর কারণে দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামানের অব্যাহতি সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থি।
এ বিষয়ে শাকিল উজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুসারে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে কোনোভাবেই আমাকে অব্যাহতি দিতে পারেন না। অব্যহতি দিতে হলে অবশ্যই উচ্চতর পরিষদের সদস্যদের সম্মতি নিতে হবে। উচ্চতর পরিষদের কোনো সদস্যই এ ব্যাপারে জানেন না। নিয়ম অনুযায়ী এটা অব্যাহতি হয়নি। এ ছাড়া রাশেদ খান যিনি বিএনপির কাছে দল বিক্রি করে দিয়েছেন, তিনি কীভাবে নির্বাচিত সর্বোচ্চ ফোরামের সদস্যকে গ্রুপ থেকে বের করে দেন।’
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেন, ‘সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের অনুমতি ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তের নামে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোসহ সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে (শাকিল উজ্জামান) সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়েছে এটাই সঠিক। এ ছাড়া এককভাবেও আমাদের অনেক প্রার্থী ট্রাক প্রতীকে অংশ নিচ্ছেন।’
গণঅধিকার পরিষদের সর্বোচ্চ ফোরাম উচ্চতর পরিষদের একাধিক সদস্য কালবেলাকে জানান, দলগতভাবে দুই সিটের বিনিময়ে সমঝোতা কেউই চাননি। কৌশলে এককভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। বিএনপি যদি সম্মানজনক আসন না ছাড়ে অর্থাৎ পাঁচ থেকে সাতটি আসন, তাহলে দলের উচ্চতর পরিষদ এবং নির্বাহী কমিটিতে ট্রাক প্রতীকে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সব ইউনিট প্রধানরাও তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। নেতাকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। পরদিন এ সিদ্ধান্ত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন নুরুল হক নুর। তবে সেটি ‘ফাঁদ’ ছিল বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। পরে একক সিদ্ধান্তেই নুর-রাশেদ বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় যান।
গণঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি ফারুক হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা সবাই একক নির্বাচনের পক্ষেই ছিলাম। জোটগতভাবে হলে সেটি হতে হবে সম্মানজনক, কোনোভাবেই দুই সিটের বিনিময়ে নয়। শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে তা দলের সিদ্ধান্তে হয়নি।’
মন্তব্য করুন