

বর্তমান উত্তরের জেলা বগুড়ার রয়েছে আদি থেকেই নগরকেন্দ্রিক ইতিহাস। আদি এই পুণ্ড্রবর্ধন নগরী মৌর্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, গুপ্ত ও পাল শাসনামল থেকে যেটি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই অঞ্চল ঘিরে অনেক আদি স্থাপনা, নিদর্শন রয়েছে, যেগুলো বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দেখভাল করে। তবে পার্শ্ববর্তী এমনও কিছু আদি স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর রহস্য এখনো প্রায় অজানা। দীর্ঘদিন গ্রামীণ ঝোপঝাড়ের অন্তরালে থাকা এমন দুটি স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোকে কোনো উপাসনালয় হিসেবে জানে স্থানীয়রা। তবে এগুলো কোন ধর্মাবলম্বীদের, তা নিশ্চিত জানা না গেলেও লোকমুখে মসজিদ আড়া নামে পরিচিতি পেয়েছে। গাছের শেকড়-বাকড়ে জড়ানো স্থাপনার ভেতরের শিল্পনৈপুণ্য নজর কাড়ার মতো। বিভিন্ন দিকে দেয়ালে প্রাকৃতিক উপস্থাপনা কৌতূহল আর রহস্যের উদ্রেক ঘটাচ্ছে।
বগুড়ার কাহালু উপজেলার মালঞ্চা ইউনিয়নের পানিসারা গ্রামের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত দীর্ঘদিন ঝোপঝাড়ের অন্তরালেই ছিল আদি স্থাপনা দুটি। বসতি কম থাকায় মানুষের কাছে ‘মসজিদ আড়া’ ছিল ভীতিকর। ধীরে ধীরে মানব বসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে চোখে পড়তে শুরু করে আর বাড়তে থাকে কৌতূহল। তবে এরই মধ্যে স্থাপনাগুলোর একটি শ্রীহীন হয়ে পড়েছে, অপরটি প্রায় ধ্বংসের পথে।
সড়কপথে বগুড়া শহর থেকে মসজিদ আড়ার দূরত্ব ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার। রানীরহাট হয়ে কাহালুর ইন্দুখুর থেকে দক্ষিণের ঢালুপথে পানিসারা। সেখানে মূল সড়ক থেকে উত্তর-পূর্ব কোণে মাত্র ২০০ গজ হাঁটলেই চোখে পড়বে ‘মসজিদ আড়া’।
সরেজমিন দেখা যায়, দুটি স্থাপনার মধ্যে একটি পাতলা ইটের চুন-সুরকির গাঁথুনিসহ চতুর্দিকে সর্বসাকল্যে প্রায় ৩২ বর্গফুট হবে। ভেতরের অংশে চার জন মানুষের দাঁড়িয়ে থাকার মতো পরিসর। স্থাপনাটির ওপরের অংশ গম্বুজের মতো, চার কোণে চারটি গোলাকার পিলার। একটি পিলার ফেঁটে গিয়ে কিছুটা আলগা হয়ে গেলেও অন্য তিনটি পিলার স্থাপনাটিকে জড়িয়ে রেখেছে। পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দুটি ‘দুয়ার’। ভেতরের অংশের পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ পাশে চাঁদের ও উত্তর পাশে সূর্যের কারুকার্য। মাঝখানে পতাকা ও দেয়ালে পদ্মফুলসহ নানা কারুকার্য এখনো দৃশ্যমান। এ ছাড়া বাহির ও ভেতরের অংশে ছোটখাটো কিছু রাখার মতো কয়েকটি তাক রয়েছে। গাছের শিকড়-বাকড়ে জড়ানো এ স্থাপনার বাইরের অংশ অনেকটাই নষ্ট হলেও ভেতরের শিল্পকর্ম নজর কাড়ার মতো ও রহস্যময়। এরই খানিকটা উত্তর-পূর্ব কোণে অপর স্থাপনাটির অনেকাংশ ধসে গেছে। ফলে সেটির আদল ও নৈপুণ্য বোঝার উপায় নেই। তবে, স্থাপনা দুটি থেকে কিছুদূর পূর্বদিকে একটি পুকুর রয়েছে যা মণ্ডলের পুকুর নামে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানান, এখান থেকে মণ্ডলের পুকুরে যাওয়ার পথ ছিল। স্তরে স্তরে সাজানো ছিল প্রাচীনকালের পাতলা ইট; এলাকার মানুষজন তুলে নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছেন। মণ্ডলের পুকুরেও চারটি পিলারযুক্ত সানবাঁধানো ঘাট ছিল। সেই ঘাটের ইটগুলোও খুলে নিয়েছে মানুষ। বর্তমানে সানবাঁধানো সেই ঘাট আর পুকুরে যাওয়ার পথের আর কোনো চিহ্নই নেই।
এ বিষয়ে মালঞ্চা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নেছার উদ্দিন জানান, প্রাচীন দুটি স্থাপনা বিষয়ে একেকজনের ধারণা একেক রকম। তবে স্থানীয়রা মনে করেন, এটি প্রাচীনকালের একটি ছোট মসজিদ। এই প্রাচীন স্থাপনা মানুষের নজরে আসার পর এখন প্রায় দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষজন আসে দেখতে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক আহমদ আব্দুল্লাহ জানান, পানিসারার দুটি প্রাচীন স্থাপনা তাদের তালিকাভুক্ত নেই। তবে এ বছরই তালিকায় থাকা যোগীর মন্দির ও আশ্রমের কিছু কাজ হবে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন