বিভিন্ন থানায় করা ২৪টি মামলার বিচার কার্যক্রম শেষে বিএনপির সর্বমোট ৩২৭ নেতাকর্মীকে সাজা দিয়েছেন ঢাকার আদালত। প্রায় ৮ থেকে ১০ বছরের পুরোনো এসব মামলার বিচার শেষে পৃথক আদালত গত ৪০ দিনে এসব রায় ঘোষণা করেন। পুরোনো মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে এগুলো নিষ্পত্তি করে রায় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে হয়রানি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এসব মামলায় সাজার রায় দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবরে থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন ২৪টি মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। ১৩ কর্মদিবসে দেওয়া এসব রায়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও অঙ্গসংগঠনের সাবেক-বর্তমান সভাপতিসহ ৩২৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫৬ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
এসব মামলার রায় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ১৯টি মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে ২৭৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত অক্টোবর মাসে আদালত পৃথক পাঁচ মামলায় ৫২ জনকে সাজা দিয়েছেন। পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতাসহ দ্রুত বিচার আইনের এসব মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে গত ৯ অক্টোবর আট বছর আগে রাজধানীর ভাটারা থানায় করা নাশকতার মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আহসান হাবিব লিংকনসহ ১৫ জনের চার বছরের সাজা দেন আদালত।
গত ৩০ অক্টোবর দশ বছর আগের বেআইনি সমাবেশে ক্ষতিসাধনের অভিযোগে রাজধানীর কলাবাগান থানার মামলায় বিএনপি নেতা ও ঢাকা-১০ আসনের এমপি প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবিসহ দশজনকে পৃথক দুই ধারায় আড়াই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান, তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সেক্রেটারি রাজিব আহসান, ছাত্রদলের সাবেক সেক্রেটারি আকরামুল হাসান মিন্টু, হাবিবুর রশিদ হাবিব ও যুবদল দক্ষিণের সভাপতি
এনামুল হক এনামকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বাবুল কালবেলাকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো মামলার বিচার শেষ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী মামলার বিচার শেষ করা হচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক মামলার কোনো বিষয় নেই। এসব মামলায় শুধু সাজা না, অনেক আসামি খালাসও পেয়েছে।
ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল বলেন, কাউকে হয়রানির উদ্দেশ্যে আদালত রায় দেন না। সাক্ষ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে রায় দেয়। তাই রাজনৈতিক বলে অপরাধকে হালকা করার কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপির আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বলেন, বিভিন্ন সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই আদালত এসব মামলার রায় দিচ্ছেন। উচ্চ আদালত পুরোনো মামলার বিচার শেষের নির্দেশনা দিলেও আদালত অন্য মামলা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক মামলা বেছে নিয়েছে। ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের বিচার না হলেও বিএনপির নেতাকর্মীর হয়রানি করতে সাজা দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘সাজাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা নেই। সাক্ষ্য প্রমাণের মাধ্যমে কোনো ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। অধিকাংশ মামলায় সাক্ষী হিসেবে শুধু পুলিশ সদস্যকে হাজির করিয়ে সাজা দেওয়া হয়েছে। কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। এমনকি ফৌজদারি কার্যবিধিতে বর্ণিত বিচারিক স্তরগুলোও অনুসরণ করা হয়নি। ফলে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি করে বিএনপি নেতাদের সাজা দেওয়া হয়েছে।