বিএনপির বর্জনের পরও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। রাজধানীর আসনগুলোর মধ্যে এ আসনেই সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের দুই নেতা। তিনজনই স্থানীয় বাসিন্দা। তিনজনেরই এলাকায় প্রভাব ও জনপ্রিয়তা আছে। এ আসনে আরও কয়েকজন প্রার্থী থাকলেও এলাকায় তারা তেমন পরিচিত নন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাই এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন এলাকাবাসী।
ঢাকা-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশিদ মুন্না। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল। এর মধ্যে সজল ট্রাক ও রিপন ঈগল প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন। মুন্নার পাশে যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের কমিটির সিংহভাগ আছেন। কামরুল স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হওয়ায় তিন থানায় এই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে পেরেছেন। সজলের পাশে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের কমিটির সিংহভাগ রয়েছেন। তার বাবা হাবিবুর রহমান মোল্লা এ আসনটিতে ১৯৯৬ সাল থেকে চারটি নির্বাচনে জিতেছিলেন। স্থানীয়ভাবে মোল্লা পরিবারের ব্যাপক পরিচিতি এবং নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
এই তিন প্রার্থীসহ এই আসনে ভোটের মাঠে রয়েছেন ১২ জন। অন্যরা হলেন ইসলামিক ঐক্য ফ্রন্টের আবু জাফর মো. হাবিবুল্লাহ (চেয়ার), ন্যাশনালিস্ট ঐক্য ফ্রন্টের এসএম লিটন (টেলিভিশন), তৃণমূল বিএনপির মো. আবু হানিফ হৃদয় (সোনালী আঁশ), ইসলামী ঐক্য জোটের আব্দুল কায়ুম (মিনার), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আরিফুর রহমান (আম), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোশাররফ হোসেন মিয়া (একতারা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের সাইফুল আলম (ডাব), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মো. সারওয়ার খান (কাঁঠাল) এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের নুরুল আমিন (ছড়ি)।
নির্বাচনী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও অলিগলি ছেয়ে আছে তিন প্রার্থী মুন্না, রিপন, সজলের পোস্টারে। পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন তারা। ভোট চাওয়ার পাশাপাশি আশ্বাস দিচ্ছেন মডেল সংসদীয় আসন গড়ার। তাদের বাইরে কয়েকজন প্রার্থীর অল্প কিছু নির্বাচনী পোস্টার দেখা গেলেও তেমন প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়েনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-৫ জাতীয় সংসদের ১৭৮ নম্বর আসন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাজধানীর প্রবেশমুখ হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই আসন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এ আসনে রয়েছে রাজধানীর পরিবহন বাণিজ্যের বড় অংশ। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও যাত্রাবাড়ী ঘিরে গড়ে উঠেছে এ পরিবহন এলাকা। ভোটারদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও আছে শ্রমজীবী ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, ২০০৮ থেকে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও এখন তিনজনের পক্ষে ভাগ হয়ে আছেন। আবার একজনের পক্ষে গেলে অন্যরা নাখোশ হন কি না, সেজন্য কেউ কেউ প্রকাশ্যে অবস্থানও নিচ্ছেন না। নেতাকর্মীরা কাকে ছেড়ে কার পক্ষে থাকবেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
চারবারের এমপির ছেলে মশিউর রহমান মোল্লা বাবার রেখে যাওয়া ভোটব্যাংক কাজে লাগিয়ে জয়ী হতে চান এ নির্বাচনে। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর এই আসনে চাঁদাবাজি, মাদক, অবৈধ জমি দখলসহ বিভিন্ন অনিয়ম বেড়ে যায়। আমি নির্বাচিত হলে মাদক-সন্ত্রাস থেকে এলাকাবাসী রেহাই পাবে। বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী একটি সরকারি হাসপাতাল করা হবে। তার অসমাপ্ত উন্নয়নের কাজ শেষ করব। বাবা সংসদ সদস্য থাকাকালীন এলাকাবাসী নিরাপদে ছিল। এখন তারাই আমাকে চাচ্ছে নিরাপদে থাকার জন্য।’
সজল আরও বলেন, ‘জনগণের সমর্থনের কারণে ঢাকা-৫ আসনে ট্রাক মার্কার গণজোয়ার শুরু হয়েছে। তিন বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে জনগণ মোল্লা পরিবারকে আস্থা-বিশ্বাসের প্রতীক বিবেচনা করছে। সে সুযোগটাকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করছি। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বেশিরভাগ ভোট আমি পাব। এর বাইরে এই আসনে আমাদের পরিবারের বিশাল শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আত্মীয়স্বজন আছে। দলীয় ভোট তিন ভাগ হলেও এসব ভোট ভাগ হবে না।’
দনিয়া কলেজে থেকে ছাত্ররাজনীতি শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পর এখন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন। করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন সমস্যায় এলাকার লোকজন তাকে কাছে পেয়েছে, তাই ভোটের মাঠেও জনসমর্থন তার দিকেই যাবে বলে ধারণা রিপনের।
তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘প্রার্থীদের সকলেরই সবার সম্পর্কে জানাশোনা আছে। নির্বাচনে মানুষ যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রার্থীকে বিবেচনা করে। সেদিক দিয়ে আমার অবস্থান ভালো মনে করি। আমি নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস, মাদক, ইভটিজিং ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তুলব। এই আসনে জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানের চেষ্টা করব। মশার উপদ্রব কমাতে কাজ করব। রাস্তাঘাটের সংস্কার করব। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাব রয়েছে। এটি জাতীয় সমস্যা হলেও সমস্যা সমাধানে কাজ করব।’
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুনর রশিদ মুন্না নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে আশা তার কর্মী-সমর্থকদের। স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর পাশাপাশি নেতাকর্মীরা তার পক্ষে প্রচারে নেমেছেন।
মুন্না বলেন, ‘অনেকেই নির্বাচন করতে পারে, তবে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকেরা আমার জন্য কাজ করছে এবং ভোটের মাধ্যমে তার প্রমাণ মিলবে।’ নৌকার এই প্রার্থী বলেন, ‘এই এলাকায় আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে আসছি। এখানের আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আমার ওঠাবসা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। এ আসনে বঙ্গবন্ধু নির্বাচন করেছেন। এখানে নৌকার বাইরে কারও কিছু বলার সুযোগ নেই।’