ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরেই আব্দুর রউফের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সোজা বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্য। পুরোটা সকাল সেখানে পাখির ছবি তুলে দুপুর ২টায় শ্রীমঙ্গল শহরে ফিরলাম। দ্রুত লাঞ্চ সেরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দিকে অটোরিকশা ছোটালাম। বিকেল ৩টা নাগাদ লাউয়াছড়া পৌঁছে গেলাম। উদ্যানের মূল ফটক দিয়ে ঢোকার পর ২০০ মিটার দূরের কালভার্ট পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের লম্বা গাছগুলো দেখতে বেশ লাগে। কালভার্ট পেরিয়ে সোজা বনে চলে যাওয়া যায়; কিন্তু আজকে তো পাখি দেখার উদ্দেশ্যে বের হইনি। আজকে দেখব রঙিন ডানার উড়ন্ত দুরন্ত পতঙ্গ প্রজাপতি। তাই কালভার্টের ওপর দিয়ে না গিয়ে ডানপাশ দিয়ে নিচে ছড়ায় নেমে গেলাম। উদ্দেশ্য ছড়া ধরে রেললাইনের নিচের কালভার্ট পাড়ি দিয়ে কমপক্ষে লেবুবাগান পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে প্রজাপতি দেখা। সে অনুযায়ী কালভার্টের নিচ দিয়ে হাঁটার প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন কালভার্টের নিচে পায়ের পাতা ভেজানো পানিতে পা রাখতেই কালভার্টের কিনারায় প্রাণীর পচে যাওয়া মলের ওপর কালোর ওপর সাদা ও হলুদ ফুটকির এক প্রজাপতি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। প্রজাপতিটিকে এর আগে শুধু মালয়েশিয়ায় দেখেছি। যদিও নোংরার কারণে সঙ্গে থাকা ভাগনে তানভীর ইয়াসির সাদমান কিছুটা আপত্তি করছিল; কিন্তু নতুন এক প্রজাপতি দেখে ওর আপত্তি পাত্তা দিলাম না। কাজেই প্রজাপতিটির ছবি তোলায় মগ্ন হয়ে পড়লাম। আর সাদমান নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে আমার কর্মকাণ্ড লক্ষ করতে থাকল। আমি বেশ সময় নিয়ে ওর কিছু ভালো ছবি তুললাম। নিলাম ভিডিও ক্লিপ। ১৯ মার্চ ২০১৫-এর ঘটনা এটি। পরের বছর একই সময় আবারও লাউয়াছড়ায় প্রজাপতিটিকে দেখলাম।
এতক্ষণ যে প্রজাপতিটির গল্প বললাম সেটি আর কেউ নয়, এ দেশের এক দুর্লভ ও সংকটাপন্ন প্রজাপতি চন্দ্রাবল্লী। পশ্চিমবঙ্গে রাজেশ্বরী নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Yellwo Helen। চেরালেজি (Swallowtail) গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio nephelus (প্যাপিলিও নেফেলাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা যায়।
চন্দ্রাবল্লী বড় আকারের কালো বর্ণের লেজওয়ালা প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় বাঁ পাশের ডানার এক প্রান্ত থেকে ডান পাশের ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত ১১৫ থেকে ১৩০ মিলিমিটার লম্বা। দেখতে অনেকটা লাল চন্দ্রাবল্লীর (Red Helen) মতো হলেও ওর ডানায় তিনটির বদলে চারটি স্পষ্ট বড় ঘিয়ে সাদা দাগ রয়েছে। সামনের ডানার নিচের দিকে চেইনের মতো কতগুলো সাদা ফুটকি থাকে। পেছনের ডানার নিচের দিকে একসারি প্রান্তীয় অর্ধচন্দ্রাকৃতির ফ্যাকাশে লাল দাগের পরিবর্তে ধূসর হলুদ অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগ থাকে। লাল চন্দ্রাবল্লীর সঙ্গে এর আরেকটি পার্থক্য হলো, পেছনের ডানার ওপরের সাদা ছোপ দুটি শিরার পরিবর্তে তিনটি শিরা দিয়ে ছেদ করেছে। পেছনের ডানা ঢেউ খেলানো।
চন্দ্রাবল্লী দেশের উত্তর-পূর্ব (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। তবে বনের আশপাশের উন্মুক্ত এলাকায়ও ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। বেশ দ্রুতগতিতে উড়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উড়ে বেড়ায়। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই রসের জন্য ফুলের ওপর স্থির হয়ে উড়ে। পুরুষগুলোকে ভিজা মাটি রসও চুষতে দেখা যায়।
জীবনচক্র অনেকটা লাল চন্দ্রাবল্লীর মতোই। তবে স্ত্রী দাহান (টোড্ডালিয়া এশিয়াটিকা), আশশ্যাওড়া (য্যান্থোজাইলাম অ্যাইলানথোইডেস), গোলাবাজনা (য্যান্থোজাইলাম ওভালিফোলিয়াম) প্রভৃতি পোষক গাছের পাতার উপরদিকে ডিম পাড়ে। শুককীট দেখতে পাখির বিষ্ঠার মতো চকচকে। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হতে ৪৩ থেকে ৫৩ দিন সময় লাগে।
লেখক: পাখি, বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, বশেমুরকৃবি, গাজীপুর